রাজধানীর উত্তরা-মতিঝিল মেট্রো রেল নির্মাণে ব্যয় যা হয়েছিলো নতুন দুটি পথে মেট্রো রেল নির্মাণে ব্যয় হবে তার দ্বিগুণের বেশি। রাজধানীর উত্তরা থেকে মতিঝিল পর্যন্ত মেট্রো রেল নির্মাণে প্রতি কিলোমিটারে ১ হাজার ৫৭৪ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছিলো। কিন্তু নতুন দুই পথে খরচ দাঁড়াচ্ছে কিলোমিটারে ৩ হাজার ৬১৮ কোটি টাকা। নতুন দুই মেট্রো রেল পথে মোট ব্যয় দাঁড়াচ্ছে ১ লাখ ৮৪ হাজার ৫০০ কোটি টাকা।
এই বিপুল ব্যয় মেট্রো রেল নির্মাণকেই অনিশ্চয়তায় ফেলছে। বিপুল ব্যয়ে মেট্রো রেল নির্মাণের বিষয়ে অন্তর্বর্তী সরকার সিদ্ধান্ত নেয়নি। নির্বাচিত বিএনপি সরকারের ওপর সিদ্ধান্তের ভার পড়েছে।
নির্মাণকাজ শুরুর অপেক্ষায় থাকা মেট্রো রেলের দুটি পথের একটি হলো কমলাপুর থেকে বিমানবন্দর পর্যন্ত এবং নর্দ্দা থেকে পূর্বাচল পর্যন্ত, নাম এমআরটি লাইন-১ (৩১ কিলোমিটারের বেশি)। অন্যটি সাভারের হেমায়েতপুর থেকে মিরপুর এবং গুলশান হয়ে ভাটারা পর্যন্ত এমআরটি লাইন-৫ (উত্তর)। এটির দৈর্ঘ্য ২০ কিলোমিটারের মতো। দুটি মেট্রো রেল লাইনেরই কিছু অংশ উড়াল ও কিছু অংশ পাতালপথে হবে।
বিশ্লেষকেরা বলছেন, মেট্রো রেল নির্মাণে এত বেশি ব্যয়ের কারণ দরপত্রে প্রতিযোগিতার সুযোগ কম থাকা। এখন প্রতিযোগিতা হচ্ছে শুধু জাপানি ঠিকাদারদের মধ্যে। প্রতিযোগিতা বাড়াতে পারলেই খরচ কমবে। ডিএমটিসিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফারুক আহমেদও একই কথা বলেন। তিনি বলেন, দুটি প্রকল্পের অর্থায়নে জাপানি ঋণদাতা সংস্থা জাইকা বেশ কিছু প্রকৌশলগত শর্ত জুড়ে দিয়েছে। ফলে ঠিকাদার নিয়োগে প্রতিযোগিতা কমে গেছে।
এ জন্যই ব্যয় অত্যন্ত বেশি।
উল্লেখ্য, মেট্রো রেল নির্মাণে ঋণ দিচ্ছে জাপান। দেশটির উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা জাইকার ঋণে এমন শর্ত দেওয়া হয়, যেখানে জাপানি কোম্পানিগুলোই ঠিকাদারি কাজ পাওয়ার ক্ষেত্রে এগিয়ে থাকে।
ঢাকার উত্তরা-মতিঝিল পথে মেট্রো রেলের সম্প্রসারিত অংশ যাবে কমলাপুর পর্যন্ত। পুরো পথের দৈর্ঘ্য ২১ দশমিক ২৬ কিলোমিটার। মতিঝিল থেকে কমলাপুর অংশের কাজ এখনো চলছে। পুরো পথে ব্যয় হচ্ছে ৩৩ হাজার ৪৭২ কোটি টাকা।
নতুন এমআরটি লাইন-১ প্রকল্পটি অনুমোদন দেওয়া হয় ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে। সরকারি প্রাক্কলনে ব্যয় ধরা হয় ৫২ হাজার ৫৬১ কোটি টাকা। এ প্রকল্পে এখন পর্যন্ত ১২টি প্যাকেজের মধ্যে ৮টিতে ঠিকাদারের প্রস্তাবিত ব্যয় পাওয়া গেছে। এর ওপর ভিত্তি করে ব্যয় বিশ্লেষণ করেছে ডিএমটিসিএল। সংস্থাটির বিশ্লেষণ বলছে, ঠিকাদারেরা গড়ে যে দর চাইছে, তাতে প্রকল্পের ব্যয় দাঁড়াবে ৯৬ হাজার ৫০০ কোটি টাকা।
অন্যদিকে লাইন-৫ (উত্তর) প্রকল্পটি অনুমোদন দেওয়া হয় ২০১৯ সালের অক্টোবরে। এর জন্য ব্যয় প্রাক্কলন করা হয়েছিল ৪১ হাজার ২৩৮ কোটি টাকা। এ পর্যন্ত ৫টি প্যাকেজে ঠিকাদারদের পাওয়া দর প্রস্তাব বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ব্যয় দাঁড়াবে ৮৮ হাজার কোটি টাকা।
উত্তরা-মতিঝিল পথের চেয়ে নতুন দুই পথে সরকার ব্যয় অনেকটা বাড়িয়ে ধরেছিল। কিলোমিটারপ্রতি ধরা হয়েছিল ১ হাজার ৮৩৯ কোটি টাকা। মোট অনুমোদিত ব্যয় ৯৩ হাজার ৭৯৯ কোটি টাকা। কিন্তু ঠিকাদারের দরপত্র প্রস্তাব অনুযায়ী কাজ দিলে মোট ব্যয় দাঁড়াবে ১ লাখ ৮৪ হাজার ৫০০ কোটি টাকা।
ডিএমটিসিএলের পক্ষ থেকে এশিয়ার বিভিন্ন দেশে বাস্তবায়নাধীন মেট্রো রেল প্রকল্পের ব্যয় বিশ্লেষণ করা হয়েছে। তাতে দেখা যায়, জমি অধিগ্রহণ ও বেতন-ভাতা বাদ দিয়ে শুধু প্রতি কিলোমিটার মেট্রো রেল নির্মাণে ভারতে ব্যয় হয় ১৫০ থেকে ৪৫০ কোটি টাকা। ভারতও বিদেশি ঋণে প্রকল্প বাস্তবায়ন করে। কিন্তু ঋণে এমন কোনো শর্ত তারা মানে না, যা ঠিকাদার নিয়োগের প্রতিযোগিতা ক্ষুণ্ন করে।
বিষয়টি নিয়ে জাইকার কাছে ই-মেইলে বক্তব্য চাওয়া হয়েছিল। জবাবে সংস্থাটি জানায়, দুটি প্রকল্পের বাড়তি ব্যয়ের বিষয়টি তারা অবগত। তবে জাইকার ক্রয়সংক্রান্ত নির্দেশিকা অনুযায়ী দরপত্র খোলার পর থেকে চুক্তি না হওয়া পর্যন্ত কোনো তথ্য বাইরে কারও কাছে প্রকাশ করা যায় না। তাই এই মুহূর্তে দরপত্র মূল্যায়নের নির্দিষ্ট কোনো বিষয়ে মন্তব্য করা তাদের পক্ষে সম্ভব নয়।
ঢাকার উত্তরা থেকে মতিঝিল পথে চলাচলকারী মেট্রো রেল থেকে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে টিকিট বিক্রি করে আয় হয়েছে ৪০০ কোটি টাকার মতো (অনিরীক্ষিত)। যদিও ২০৩০-৩১ সাল পর্যন্ত বছরে ঋণের কিস্তি হিসেবে ৪৬৫ কোটি থেকে ৭৪০ কোটি টাকা দিতে হবে।
ডিএমটিসিএল সূত্র জানায়, এর আগে গত বছরের ১৮ জুন কচুক্ষেত থেকে ভাটারা পর্যন্ত মেট্রোরেলের পথ ও স্টেশন নির্মাণে (মাটির নিচ দিয়ে) আরেকটি দরপত্র খোলা হয়। এতে দেখা যায়, ১৫ হাজার ৫২৭ কোটি টাকায় সর্বনিম্ন দরদাতা হয়েছে জাপানের তাইসি ও দক্ষিণ কোরিয়ার স্যামসাং (যৌথ)। এই অংশের জন্য প্রাক্কলিত ব্যয় নির্ধারিত আছে ৩ হাজার ৯৬৮ কোটি টাকা। প্রাক্কলিত ব্যয়ের তুলনায় ঠিকাদারের দর ৩৯১ দশমিক ৩১ শতাংশ বেশি। টাকার অঙ্কে ঠিকাদারের পেছনে বাড়তি ব্যয় হবে ১১ হাজার ৫৫৯ কোটি টাকা।
জাইকার শর্তানুযায়ী, ঠিকাদারের প্রস্তাবিত দরে কোনো ভুল না থাকলে সর্বনিম্ন দরদাতা হিসেবে শিমুজি করপোরেশন এবং তাইসি-স্যামসাং (যৌথ) নিয়োগ পাবে। কিন্তু ডিএমটিসিএল কর্তৃপক্ষ তাইসি-স্যামসাংয়ের দর প্রস্তাব গ্রহণ না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। শিমুজিকে নিয়োগ না দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে।
ডিএমটিসিএল কর্মকর্তারা বলছেন, দুটি প্যাকেজে ঠিকাদারের পক্ষ থেকে অস্বাভাবিক ব্যয় প্রস্তাবের পেছনে ‘যোগসাজশের’ সন্দেহ করা হচ্ছে। মিরপুর থেকে কচুক্ষেত অংশের কাজের দরপত্র আহ্বান করলে ১৩টি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান প্রাথমিক দরপত্র কেনে। জমা দেয় ছয়টি প্রতিষ্ঠান। মূল দরপত্র কেনে মাত্র দুটি প্রতিষ্ঠান এবং তারাই চূড়ান্ত দর প্রস্তাব করে। কচুক্ষেত থেকে ভাটারা অংশের কাজের দরপত্র আহ্বান করলে ১৫টি প্রতিষ্ঠান প্রাথমিক দরপত্র সংগ্রহ করে। জমা দেয় চারটি প্রতিষ্ঠান। চূড়ান্ত দরপত্র কেনে তিনটি প্রতিষ্ঠান। জমা দেয় দুটি প্রতিষ্ঠান।
দরপত্র প্রক্রিয়া বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, দুটি প্যাকেজেই চূড়ান্তভাবে দরপত্র কেনে এবং জমা দেয় শিমুজি করপোরেশনের নেতৃত্বে কনসোর্টিয়াম এবং তাইসি-স্যামসাং। এর মধ্যে একটিতে শিমুজি করপোরেশন সর্বনিম্ন দরদাতা হয় এবং দ্বিতীয় সর্বনিম্ন দরদাতা হয় তাইসি-স্যামসাং। অন্যটিতে ঠিক উল্টো তাইসি-স্যামসাং সর্বনিম্ন দরদাতা হয়। শিমুজি হয় দ্বিতীয় সর্বনিম্ন দরদাতা।
ব্যয় কমানোর জন্য ঋণদাতা সংস্থা ও ঠিকাদারকে তাগিদ দিয়েছিল অন্তর্বর্তী সরকার। কিন্তু সাড়া না পেয়ে এত বিপুল ব্যয়ে মেট্রো রেল নির্মাণে আগ্রহ দেখায়নি।
মেট্রোরেলের লাইন-১ প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হবে আগামী ডিসেম্বরে। আর লাইন-৫ (উত্তর) মেয়াদ আছে ২০২৮ সাল পর্যন্ত। তবে এখনো ঠিকাদারই নিয়োগ সম্পন্ন করা যায়নি। এই পরিস্থিতিতে প্রকল্প দুটির ভবিষ্যৎ করণীয় সম্পর্কে সিদ্ধান্ত জানাতে গত জানুয়ারির শেষ সপ্তাহে সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয় ও পরিকল্পনা কমিশনে চিঠি দেয় ডিএমটিসিএল কর্তৃপক্ষ। দুটি চিঠিতে তারা প্রকল্প দুটির বিপুল ব্যয় বৃদ্ধির বিষয়টি উল্লেখ করে জানায়, প্রকল্প প্রস্তাব সংশোধন করতে হবে। প্রকল্প দুটির ব্যয় কমানোর নানা পন্থা উল্লেখ করে। এর মধ্যে রয়েছে ঠিকাদার নিয়োগে উন্মুক্ত প্রতিযোগিতা আনতে জাইকার চাপিয়ে দেওয়া প্রকৌশলগত শর্ত পরিবর্তন। নতুন সরকার এখনো বিষয়টি নিয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক সামছুল হক বলেন, মেট্রো রেল নির্মাণ প্রকল্পের ঠিকাদার নিয়োগপ্রক্রিয়ায় যে খবর পাওয়া যাচ্ছে, তাতে এটা নিশ্চিত, সেখানে প্রতিযোগিতা হচ্ছে না। এ জন্যই বিপুল ব্যয়ের বোঝা চাপছে। এই ব্যয়ে মেগা প্রকল্প করলে বাংলাদেশ দেউলিয়া হয়ে যাবে।
সামছুল হক বলেন, নতুন সরকারের মূল কাজ হওয়া উচিত ব্যয় কমাতে প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করা। এর জন্য ঋণের শর্ত পরিবর্তন করতে হবে।
এদিকে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে গত ২০ জানুয়ারি এক অনুষ্ঠানে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেন, বিএনপি ক্ষমতায় গেলে মেট্রো রেলের পাশাপাশি ঢাকায় মনোরেল চালু করা হবে। মোহাম্মদপুর, বনানীসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে মনোরেলকে মেট্রোরেলের সঙ্গে যুক্ত করার পরিকল্পনা তুলে ধরেন তিনি। এরই মধ্যে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ১৭ ফেব্রুয়ারি শপথ নিয়েছেন তিনি। এখন দেখার বিষয় নতুন সরকার কী সিদ্ধান্ত নেয়।
এমএন