মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা তীব্র আকার ধারণ করছে। এর মধ্যে ইরান তাদের এক পারমাণবিক স্থাপনার কাছে অবস্থিত ভূগর্ভস্থ একটি কমপ্লেক্সকে আগের তুলনায় মজবুত করছে। মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাপক সামরিক উপস্থিতি ঘিরে উত্তেজনা এবং তেহরানের পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে তাদের সঙ্গে ওয়াশিংটনের চলমান আলোচনার মধ্যেই তেহরানের এ নতুন তৎপরতার বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া গেল। এরই মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সতর্কবার্তা দিয়ে বলেছেন— হয় ইরান সমঝোতায় আসবে, নয় আবারও অপারেশন ‘মিডনাইট হ্যামার’। পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যে আরও একটি মার্কিন বিমানবাহী রণতরী পাঠানোর ঘোষণা উত্তেজনা বাড়িয়ে দিয়েছে। ফলে প্রশ্ন উঠছে, তবে কি ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাত অনিবার্য হয়ে উঠছে?
স্যাটেলাইট চিত্রের তথ্য বিশ্লেষণ করে পশ্চিমা কূটনৈতিক সূত্রের দাবি, ইরান তাদের গুরুত্বপূর্ণ পারমাণবিক স্থাপনাগুলোর আশপাশে নতুন করে শক্তিশালী ভূগর্ভস্থ অবকাঠামো নির্মাণ ও পুরোনো কমপ্লেক্সগুলো পুনর্গঠনের কাজ জোরদার করেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সম্ভাব্য বিমান হামলা বা ক্ষেপণাস্ত্র আক্রমণ থেকে স্থাপনাগুলোকে সুরক্ষিত রাখতেই এ উদ্যোগ। অতীতে ইরানের নাতাঞ্জ ও ফোরদো কেন্দ্র নিয়ে আন্তর্জাতিক উদ্বেগ দেখা দিয়েছিল; এবারও একই ধরনের আশঙ্কা উঁকি দিচ্ছে।
ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ইরান যদি তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি সীমিত না করে এবং আন্তর্জাতিক পরিদর্শন ব্যবস্থায় পূর্ণ সহযোগিতা না দেয়, তাহলে ‘সব বিকল্প খোলা রয়েছে।’ ইরানের সঙ্গে হয় সমঝোতা, নয়তো ফের ‘মিডনাইট হ্যামার’ এর মতো সামরিক অভিযান চালানো হবে বলে হুমকি দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। বৃহস্পতিবার হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে এ হুমকি দেন তিনি।
বিশ্লেষকদের অনুমান, প্রয়োজনে দ্রুত ও লক্ষ্যভিত্তিক হামলার পরিকল্পনা প্রস্তুত রয়েছে ট্রাম্পের।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যে তাদের নৌ-সামরিক উপস্থিতি জোরদার করছে। প্রতিরক্ষা দপ্তরের বরাতে জানা গেছে, পারস্য উপসাগর ও আশপাশের জলসীমায় অতিরিক্ত একটি বিমানবাহী রণতরী মোতায়েন করা হচ্ছে। এর ফলে অঞ্চলে মার্কিন সামরিক সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে। বিশ্লেষকদের মতে, এটি একদিকে প্রতিরোধমূলক কৌশল, অন্যদিকে ইরানের প্রতি কড়াবার্তা।
অন্যদিকে ইরান সরকার বলছে, তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ এবং আন্তর্জাতিক আইনসম্মত। তেহরানের এক মুখপাত্র জানান, ‘আমরা আত্মরক্ষামূলক অবকাঠামো গড়ে তুলছি। এটি কোনো আগ্রাসী পদক্ষেপ নয়।’ একই সঙ্গে তারা যুক্তরাষ্ট্রকে ‘উসকানিমূলক সামরিক উপস্থিতি’ বন্ধ করার আহ্বান জানিয়েছে।
আন্তর্জাতিক মহলে উদ্বেগ বাড়ছে। ইউরোপীয় কূটনীতিকরা উভয় পক্ষকে সংযম প্রদর্শনের আহ্বান জানিয়েছেন। তাদের মতে, কূটনৈতিক আলোচনার পথ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়নি। তবে সামরিক প্রস্তুতি ও কড়া ভাষার পাল্টাপাল্টি বিবৃতি পরিস্থিতিকে অস্থিতিশীল করে তুলছে।
বিশেষজ্ঞদের একাংশ মনে করছেন, সরাসরি পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ এখনো সম্ভাবনার বাইরে। কারণ, উভয় দেশই জানে এমন সংঘাত পুরো অঞ্চলে অস্থিরতা ছড়াবে—যার প্রভাব পড়বে জ্বালানি বাজার, বাণিজ্য ও বৈশ্বিক নিরাপত্তায়। তবে সীমিত আকারের হামলা, প্রক্সি গোষ্ঠীর মাধ্যমে পাল্টা আঘাত বা সাইবার আক্রমণের ঝুঁকি উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
মধ্যপ্রাচ্যে আগ থেকেই বিভিন্ন সংঘাত চলমান। এ প্রেক্ষাপটে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র উত্তেজনা নতুন মাত্রা যোগ করছে। কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার না হলে এবং পারস্পরিক আস্থার ঘাটতি দূর না হলে পরিস্থিতি দ্রুত অবনতির দিকে যেতে পারে।
সব মিলিয়ে ভূগর্ভস্থ পারমাণবিক কমপ্লেক্স শক্তিশালীকরণ, ‘মিডনাইট হ্যামার’-এর হুমকি এবং মার্কিন রণতরী মোতায়েন—এ তিন উপাদান বর্তমান সংকটকে স্পষ্টতই গভীর করেছে। তবে সংঘাত অনিবার্য কি না, তা নির্ভর করছে আগামী দিনগুলোর কূটনৈতিক পদক্ষেপ, পারস্পরিক বার্তা ও আঞ্চলিক সমীকরণের ওপর। বিশ্ববাসীর নজর এখন তেহরান ও ওয়াশিংটনের দিকে।
এমএন