নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণে পরিবারতন্ত্র ও নয়া ফ্যাসিবাদকে বয়কট করার আহ্বান জানিয়েছেন বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ, কূটনীতিক, আইনজ্ঞ ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা। তারা বলেছেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে যে বৈষম্যহীন, দুর্নীতিমুক্ত ও মানবিক বাংলাদেশের স্বপ্ন সৃষ্টি হয়েছিল, তা বাস্তবায়নে আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ইন্টারন্যাশনাল সিভিল রাইটস ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে “জুলাই গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নের নয়া চ্যালেঞ্জ এবং উত্তরণের উপায়: প্রেক্ষিত ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচন” শীর্ষক এক গোলটেবিল বৈঠক রবিবার (০৮ ফেব্রুয়ারি) বিকেলে জাতীয় প্রেসক্লাবের তোফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া হলরুমে অনুষ্ঠিত হয়।
মানারাত ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির ভাইস চ্যান্সেলর অধ্যাপক ড. আব্দুর রবের সভাপতিত্বে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে কী-নোট উপস্থাপন করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিন্যান্স বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. এইচ. এম. মোশারফ হোসেন।
অনুষ্ঠানে প্রধান বক্তা হিসেবে বক্তব্য রাখেন ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর প্রফেসর ড. মো. শামছুল আলম। এছাড়া আলোচনায় অংশ নেন নেক্সস ডিফেন্স অ্যান্ড জাস্টিস’র সভাপতি বিঃ জেঃ মোহাম্মদ হাসান চাখির, সাবেক রাষ্ট্রদূত সাকিব আলী, সুইডেনের ব্লেকিংয়ে ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির ড. এ. এম. এম. শহীদুজ্জামান কোরেশী, রাঙ্গামাটি ইউনিভার্সিটির ড. আবু তালেব, সাউথ-ইস্ট ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক এম. এ. হাই (বীর মুক্তিযোদ্ধা), বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ও ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের নায়েবে আমীর এডভোকেট ড. হেলাল উদ্দিন এবং বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ডা. আতিউর রহমান।
বক্তারা বলেন, আওয়ামী স্বৈরতান্ত্রিক ও ফ্যাসিবাদী দুঃশাসনের ফলে যখন দেশের মানুষের নিশ্বাস রুদ্ধ হয়ে আসছিল, তখন ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট এক নতুন ইতিহাসের সূচনা হয়। জুলাই মাসজুড়ে সংঘটিত গণঅভ্যুত্থানে লক্ষ লক্ষ মানুষ সরাসরি অংশগ্রহণ করে এবং কোটি-কোটি মানুষ নৈতিক সমর্থন দেয়। এর ফলে জনগণের মধ্যে একটি নতুন আশার জন্ম নেয়—বাংলাদেশ হবে এমন একটি দেশ, যেখানে মানুষ স্বাধীনভাবে বাঁচবে এবং দুঃশাসন ও দুর্নীতি ইতিহাসের জাদুঘরে স্থান নেবে।
তবে বক্তারা গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, গণঅভ্যুত্থানের মাত্র দেড় বছরের মাথায় সেই আশার আলো অনেকটাই ম্লান হয়ে যাচ্ছে। আশঙ্কা রয়েছে, সঠিক সিদ্ধান্ত না নিলে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর দেশ আবারও দুঃশাসন ও দুর্নীতির অন্ধকারে নিমজ্জিত হতে পারে।
তারা বলেন, এই সংকটময় সময়ে সচেতন নাগরিক সমাজের দায়িত্ব হলো জনগণকে এমন প্রার্থী নির্বাচনে উদ্বুদ্ধ করা, যাদের ব্যক্তিগত জীবনে দুর্নীতি ও দুঃশাসনের অভিযোগ নেই। যাদের হাতে জাদুর কাঠি না থাকলেও রয়েছে সততা, মানবিকতা, উন্নত নৈতিক চরিত্র ও নিখাদ দেশপ্রেম। এমন নেতৃত্বই দেশের ১৮ কোটি মানুষের শক্তিকে ঐক্যবদ্ধ করে একটি উন্নত, কল্যাণমূলক ও সমৃদ্ধ রাষ্ট্র গঠনের মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে পারে।
সভাপতির বক্তব্যে অধ্যাপক ড. আব্দুর রব বলেন, নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণে সবার আগে পরিবারতন্ত্রকে স্পষ্টভাবে ‘না’ বলতে হবে। তিনি বলেন, দুর্নীতি ও সন্ত্রাসের বিষবৃক্ষ পরিবারতন্ত্রকে ভোটের মাধ্যমেই উপড়ে ফেলতে হবে। তার ভাষায়, “এটা দিবালোকের মতো স্পষ্ট যে বিএনপি ক্ষমতায় এলে তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হবেন এবং তার অনুপস্থিতিতে তার স্ত্রী ও কন্যা একই ধারাবাহিকতায় থাকবে। এই পরিবারতান্ত্রিক রাজনীতি মুক্তিযুদ্ধ ও জুলাই গণঅভ্যুত্থানের বৈষম্যবিরোধী চেতনার সঙ্গে সরাসরি সাংঘর্ষিক।”
তিনি আরও বলেন, নয়া ফ্যাসিবাদী কর্মকাণ্ড ও বয়ান প্রদানকারীদের অবশ্যই বর্জন করতে হবে। গণঅভ্যুত্থানের পর একটি রাজনৈতিক দল স্থানীয় সরকারের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ফ্যাসিবাদী কায়দায় দখল করেছে এবং সরকারি অফিস-আদালতের ওপর প্রভাব বিস্তার করছে। এতে বিচার বিভাগ, যা আওয়ামী সরকারের সময় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল, এখন নয়া ফ্যাসিবাদের কারণে আরও দুর্বল হয়ে পড়ছে।
তিনি বিএনপির আইন সম্পাদক ব্যারিস্টার কায়সার কামালের বিরুদ্ধে আদালতে অবৈধ হস্তক্ষেপের অভিযোগ তুলে বলেন, এর ফলেই আওয়ামী ডেভিল ফয়সাল আহমেদ জামিনে মুক্ত হয়ে শহীদ ওসমান বি হাদীকে হত্যা করার সুযোগ পায়। পুরোনো দুঃশাসনের কাঠামো থেকে দেশকে মুক্ত করতে পরিবর্তনের পক্ষে অবস্থান নেওয়ার জন্য তিনি দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানান।
অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন রমনা সমাজ কল্যাণ সোসাইটির চেয়ারম্যান আবদুস সাত্তার সুমনসহ বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও নাগরিক সংগঠনের বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ।