মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, তিনি আশ্বস্ত হয়েছেন যে, ইরানে সরকারবিরোধী বিক্ষোভকারীদের হত্যা বন্ধ হয়েছে। একই সঙ্গে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি জানিয়েছেন, তেহরানের পক্ষ থেকে কারও মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ‘কোনো পরিকল্পনা নেই’।
স্থানীয় সময় বুধবার (১৪ জানুয়ারি) সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে ট্রাম্প বলেন, তাকে জানানো হয়েছে যে বিক্ষোভকারীদের হত্যাকাণ্ড বন্ধ হয়েছে এবং পরিকল্পিত ফাঁসিও স্থগিত করা হয়েছে। ইরানে হামলার হুমকি দেওয়ার পর তার এই বক্তব্য সংকট নিয়ে তুলনামূলক নরম অবস্থানের ইঙ্গিত দিচ্ছে বলে মনে করা হচ্ছে।
কাতারের একটি মার্কিন ঘাঁটি থেকে কিছু সেনা প্রত্যাহার শুরুর কয়েক ঘণ্টা পর ট্রাম্প জানান, তিনি ‘অন্য পক্ষের খুব গুরুত্বপূর্ণ সূত্রের’ সঙ্গে কথা বলেছেন এবং পরিস্থিতি কীভাবে এগোয় তা তিনি দেখবেন। তবে সম্ভাব্য মার্কিন সামরিক পদক্ষেপের বিষয়টি পুরোপুরি নাকচও করেননি তিনি।
ট্রাম্প বলেন, ‘আমরা দেখব প্রক্রিয়াটা কীভাবে এগোয়’ । তিনি আরও জানান, ইরানের পক্ষ থেকে যুক্তরাষ্ট্র একটি ‘খুব ভালো বিবৃতি’ পেয়েছে।
পরে ফক্স নিউজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি বলেন, বিক্ষোভকারীদের ফাঁসি দেওয়ার কোনো পরিকল্পনাই নেই। তিনি বলেন, ‘ফাঁসির প্রশ্নই ওঠে না’।
ওয়াশিংটন থেকে আল জাজিরার প্রতিবেদক মাইক হান্না জানান, ট্রাম্পের বক্তব্যে ইরানের প্রতি তার অবস্থান কিছুটা নরম হওয়ার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। তার ভাষায়, ট্রাম্প এখনো বিভিন্ন বিকল্প নিয়ে ভাবছেন, তবে তাৎক্ষণিক সামরিক পদক্ষেপ থেকে সরে আসার ইঙ্গিত মিলছে।
সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল পলিসির সিনিয়র গবেষক সিনা তুসসি আল জাজিরাকে বলেন, ট্রাম্পের এই বক্তব্য হয়তো সামরিক হস্তক্ষেপ এড়ানোর একটি ‘সম্মান রক্ষার পথ’। তবে একেবারে সংঘাতের সম্ভাবনা শেষ হয়ে গেছে—এমনও বলা যাচ্ছে না।
তুসসি আরও বলেন, ‘ট্রাম্প বড় ও দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়তে অনাগ্রহী। ইরানের ক্ষেত্রে সেই ঝুঁকি ছিল। আজকের মন্তব্যে মনে হচ্ছে, তিনি পরিস্থিতি থেকে সম্মানজনকভাবে সরে আসার পথ খুঁজছেন।’
স্টিমসন সেন্টারের বিশ্লেষক বারবারা স্লাভিন বলেন, ইরান নিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে গিয়ে ট্রাম্প সম্ভবত দ্বিধায় আছেন। তিনি হয়তো ‘আরেকটি দ্রুত জয়’ চান, কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধে জড়াতে চান না। তার ধারণা, ট্রাম্প সীমিত আকারে হামলা চালাতে পারেন, যাতে তিনি ইরানের জনগণকে ‘সহায়তা করার’ প্রতিশ্রুতি পূরণের দাবি করতে পারেন, কিন্তু বড় ধরনের যুদ্ধ এড়ানো যায়।
এর আগে বুধবার যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্র কাতারের একটি বিমানঘাঁটি থেকে কিছু কর্মী সরিয়ে নেয়, কারণ এক ইরানি কর্মকর্তা হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন—যুক্তরাষ্ট্র হামলা করলে তেহরান প্রতিবেশী দেশগুলোতে থাকা মার্কিন ঘাঁটিতে আঘাত হানবে।
ইরান জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র হস্তক্ষেপ করলে তারা পাল্টা জবাব দিতে প্রস্তুত। ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি)-এর প্রধান মোহাম্মদ পাকপুর বলেছেন, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের ‘ভুল হিসাবের’ জবাবে ইরান ‘নির্ণায়কভাবে’ প্রতিক্রিয়া জানাতে প্রস্তুত।
রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে প্রচারিত এক বিবৃতিতে পাকপুর বলেন, আইআরজিসি এখন ‘সর্বোচ্চ প্রস্তুত অবস্থায়’ রয়েছে। তিনি ট্রাম্প ও ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে ‘ইরানের যুবকদের হত্যাকারী’ বলেও আখ্যা দেন।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি ফক্স নিউজকে বলেন, তিন দিনব্যাপী ‘সন্ত্রাসী তৎপরতার’ পর এখন পরিস্থিতি শান্ত এবং সরকার পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে আছে।
ডিসেম্বরে স্থানীয় মুদ্রার দরপতন ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির প্রতিবাদে দোকানিরা রাস্তায় নামলে আন্দোলনের সূচনা হয়, যা পরে দেশজুড়ে সরকারবিরোধী বিক্ষোভে রূপ নেয়।
ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম স্বীকার করেছে, সহিংসতায় বহু মানুষ নিহত হয়েছে। সরকারপক্ষ বলছে, ‘সশস্ত্র ও সন্ত্রাসী গোষ্ঠী’ এর জন্য দায়ী।
রাষ্ট্রীয় হিসাবে, দুই সপ্তাহের অস্থিরতায় ১০০–এর বেশি নিরাপত্তাকর্মী নিহত হয়েছেন। তবে বিরোধীদের দাবি, নিহতের সংখ্যা আরও বেশি এবং তাতে হাজারো বিক্ষোভকারী রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক হিউম্যান রাইটস অ্যাক্টিভিস্টস নিউজ এজেন্সি বলেছে, তারা দুই হাজার ৪০০–এর বেশি বিক্ষোভকারীর মৃত্যুর তথ্য নিশ্চিত করেছে। তবে আল জাজিরা স্বাধীনভাবে এসব সংখ্যা যাচাই করতে পারেনি।
এদিকে ইরানে প্রায় সম্পূর্ণ টেলিযোগাযোগ বিচ্ছিন্ন রয়েছে। নেটব্লকস জানিয়েছে, এই ব্ল্যাকআউট ১৪৪ ঘণ্টা ছাড়িয়েছে।
মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল জানিয়েছে, তারা এমন প্রমাণ পেয়েছে যা ইঙ্গিত করে—গত এক সপ্তাহে ইরানে ‘অভূতপূর্ব মাত্রায় বেআইনি হত্যাকাণ্ড’ ঘটেছে, যেখানে বেশিরভাগই ছিল শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারী ও সাধারণ মানুষ। সংস্থাটি বলেছে, নিরাপত্তা বাহিনী মাথা ও চোখ লক্ষ্য করে গুলি চালিয়েছে—এমন ভিডিও প্রমাণও তারা পর্যালোচনা করেছে।
এমকে