ক্যাটাগরি: রাজনীতি

আমরা বোঝাপড়ার কোনো নির্বাচন চাই না: জামায়াত আমির

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, আমরা বোঝাপড়ার কোনো নির্বাচন চাই না। বোঝাপড়া হবে রাজনৈতিক দলগুলোর ভোটারদের সঙ্গে, কোনো অথরিটির সঙ্গে নয়।

সোমবার রাতে (১২ জানুয়ারি) রাজধানীর বাংলাদেশ চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রের সেলিব্রেটি হলে বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত সামরিক কর্মকর্তাদের সঙ্গে মতবিনিময় করে তিনি এ কথা বলেন।

কর্নেল (অব.) আব্দুল বাতেনের সভাপতিত্বে এবং কর্নেল (অব.) জাকারিয়ার সঞ্চালনায় ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এবিএম গোলাম মোস্তফার কোরআন তেলাওয়াতের মাধ্যমে অনুষ্ঠানটি শুরু হয়।

অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা আবদুল হালিম, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এবং কেন্দ্রীয় প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের প্রধান অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব এবং কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য মোবারক হোসাইন।

কর্নেল (অব.) হাসিনুর রহমান বীর প্রতীক, মেজর জেনারেল (অব.) মাহাবুব উল আলম, মেজর (অব.) আখতারুজ্জামান, মেজর (অব.) ব্যারিস্টার সরোয়ার হোসেনসহ অনেকে এ সময় বক্তব্য দেন।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, আমরা এমন একটি নির্বাচন চাই, যেখানে প্রতিটি নাগরিক বিনা চ্যালেঞ্জে ভোটকেন্দ্রে যাবে, আনন্দের সঙ্গে ভোট দেবে এবং ভোটের প্রতিফলন পাবে। তবেই নির্বাচন হবে নিরপেক্ষ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য।

তিনি বলেন, গুড গভর্ন্যান্সের পূর্বশর্ত হলো- একটি সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন। জনগণ যাকে খুশি তাকে ভোট দেবে-সে পরিবেশ তৈরি করতে হবে সরকার ও নির্বাচন কমিশনকে। তা না পারলে পদ থেকে সরে যাওয়া উচিত।

যুবকদের উদ্দেশে তিনি বলেন, তোমরা এবার ভোট দেবে। আমরা তোমাদের ভোট পাহারা দেব। তোমরা জাতির পাহারাদার হবে।

অবসরপ্রাপ্ত সামরিক কর্মকর্তাদের উদ্দেশে তিনি বলেন, আপনারা জাতিকে আঞ্চলিক নিরাপত্তা দিয়েছেন। এখন আপনাদের সামাজিক দায়বদ্ধতা রয়েছে। পরবর্তী প্রজন্মকে ভালো কিছু দেওয়াই সবচেয়ে জরুরি।

জামায়াত আমির বলেন, আমরা দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াই করছি। নিজেরা দুর্নীতি করব না, কাউকে করতেও দেব না। আমরা দুর্নীতির মূল ধরে টান দিতে চাই।

তিনি বলেন, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় কোনো সিভিলিয়ানের মুখ দিয়ে যুদ্ধের ঘোষণা হয়নি, এটি হয়েছে সেনাবাহিনীর মাধ্যমে। এ বিষয়ে একবারই ইতিহাস রচিত হয়েছে এবং তা অক্ষুণ্ন থাকবে- যে যত চেষ্টা করুক। অনেকে এটিকে ম্লান করতে চান, যা অবিচার।

তিনি বলেন, এটি ছিল রাজনীতিবিদদের দায়িত্ব। তারা তা না করায় সেনাবাহিনীর একজন অফিসার এ মহান দায়িত্ব পালন করেছেন। জাতির জন্য তার অবদান অস্বীকার করা মানে নিজেকেই অস্বীকার করা।

মুক্তিযুদ্ধের সময় নেতৃত্বদানকারী জেনারেল আতাউল গণি ওসমানীকে জাতির মানসপট থেকে ভুলিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। স্বাধীনতার প্রথম পতাকা উত্তোলনকারী আ স ম আব্দুর রবকেও যথাযথভাবে স্মরণ করা হয় না। বীরদের অবশ্যই আমাদের স্বীকৃতি দিতে হবে, সম্মান জানাতে হবে। নইলে নতুন করে বীর জন্মাবে না, যোগ করেন তিনি।

বাংলাদেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও প্রতি ইঞ্চি মাটির জন্য সেনাবাহিনী লড়াই করেছে। লড়াই করতে গিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামে অসংখ্য অফিসার ও সেনা জীবন দিয়েছেন। তারা জীবন দিয়েছেন, কিন্তু এক ইঞ্চি মাটি কাউকে দেননি।

তিনি বলেন, চব্বিশের এ আন্দোলনে আপামর জনগণ যেভাবে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল, আপনাদের সেই দিনের ভূমিকা বিশেষভাবে আলোড়িত করেছিল। অফিসার ও মায়েদের সাহসী ভূমিকা পথ দেখিয়েছে।

ডা. শফিকুর রহমান বলেন, আগস্টের ৩ ও ৪ তারিখ সবচেয়ে মজলুম দল ছিল জামায়াত। জনতার আন্দোলন দমাতে গিয়ে অতীতের মতো নোংরা উদ্যোগ নিয়ে জামায়াতে ইসলামীকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। জনগণ এ ঘোষণা মেনে নেয়নি। ফ্যাসিবাদ ও ফ্যাসিবাদের দোসররা ছাড়া জাতীয়তাবাদীরাও এর প্রতিবাদ করেছে। এজন্য তিনি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।

তিনি আরও বলেন, আমরা সেদিন দল রক্ষার জন্য নয়, দেশ রক্ষার জন্য লড়াই করেছি। এ আন্দোলনে যদি কোনো অবদান থাকে, সেটি জাতির প্রতি উপহার-দায়িত্ব পালনের একটি স্মারক এবং আমাদের রাজনৈতিক নৈতিক দায়বদ্ধতা।

তিনি বলেন, আজ পর্যন্ত আমরা এ পরিবর্তনকে বিপ্লব বা গণঅভ্যুত্থান- যে ভাষাতেই বলা হোক না কেন-তার ক্রেডিট দল হিসেবে দাবি করিনি।

বর্তমান সরকারপ্রধান বিদেশে বসে এক ব্যক্তিকে আন্দোলনের ‘মাস্টারমাইন্ড’ বলেছিলেন, যার প্রতিবাদ জানিয়ে তিনি বলেন, এ আন্দোলনে সব জনগণই মাস্টারমাইন্ড।

ডা. শফিকুর রহমান বলেন, আমরা কোনো শহীদকে দলীয় পরিচয় দিতে চাই না। দলীয় পরিচয় দিলে শহীদদের খাটো করা হয়। তারা এ জাতির সম্পদ। জাতি হিসেবে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে হলে যারা নেতৃত্ব দেবেন, তাদের শ্রদ্ধার সঙ্গে ধারণ করতে হবে। সেনাবাহিনীকে আমরা সেই জায়গায় পেয়েছি এবং তাদের নিয়ে আরও এগিয়ে যেতে চাই।

তিনি আরও বলেন, প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতিরও জবাবদিহিতা থাকতে হবে। কেউ জবাবদিহির ঊর্ধ্বে নয়। এটি পারস্পরিক ভারসাম্যের বিষয়।

ডা. শফিকুর রহমান বলেন, দেশের সীমানা অক্ষুণ্ন রাখবে সেনাবাহিনী। সীমানা ঠিক থাকলে ভেতরের কার্যক্রম ঠিক থাকবে, না থাকলে সব এলোমেলো হয়ে যাবে। এ স্বীকৃতি অবশ্যই দিতে হবে।

তিনি বলেন, শাসনযন্ত্র ও রাষ্ট্রযন্ত্রে যারা থাকবেন, তাদের মধ্যে পয়েন্ট টু পয়েন্ট বোঝাপড়া থাকতে হবে। সামান্য ঘাটতিতেই দেশ ক্ষতিগ্রস্ত হবে। প্রত্যেকের নির্দিষ্ট জব ডেসক্রিপশন ও সীমা থাকতে হবে। সীমা লঙ্ঘন হলে বিপর্যয় অনিবার্য এবং সেখান থেকেই ফ্যাসিবাদের জন্ম হয়। প্রত্যেক পেশাজীবী কোনো ভয়-ভীতি ছাড়াই দায়িত্ব পালন করবে- এমন বাংলাদেশ গড়তে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী।

জামায়াত আমির বলেন, আমরা এখন ভয়-ভীতির মধ্যে বসবাস করছি। আমরা সেনাবাহিনীকে দেখতে চাই-তারা বিশ্বের দরবারে বাংলাদেশকে তুলে ধরবে। সেনাবাহিনীকে তার পেশাগত দায়িত্বে আরও মনোযোগী হতে হবে।

ডা. শফিকুর রহমান বলেন, আমরা আমাদের দেশকে অগ্রসর দেশ হিসেবে দেখতে চাই। পরবর্তী প্রজন্মের হাতে একটি নিরাপদ দেশ তুলে দিতে চাই। আমরা বেকারভাতা দিয়ে অলস জাতি গড়তে চাই না, তবে যারা অক্ষম, তাদের জন্য রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালন করা হবে, ইনশাআল্লাহ।

এমকে

শেয়ার করুন:-
শেয়ার