দেশে স্মার্টফোনের অবৈধ বাজার বা ‘গ্রে মার্কেট’-এর কারণে সরকার প্রতি বছর আনুমানিক ৫ হাজার থেকে ৬ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব হারাচ্ছে বলে দাবি করেছেন মোবাইল ফোন উৎপাদনকারীরা। এই বিশাল ক্ষতি রোধে এবং বিকাশমান দেশীয় মোবাইল শিল্প রক্ষায় অবিলম্বে ন্যাশনাল ইকুইপমেন্ট আইডেন্টিটি রেজিস্টার (এনইআইআর) বা মোবাইল ফোন নিবন্ধন ব্যবস্থা কঠোরভাবে বাস্তবায়নের দাবি জানিয়েছেন তারা।
সোমবার (৬ জানুয়ারি) রাজধানীর একটি হোটেলে ‘এনইআইআর-এর মাধ্যমে নিরাপদ বাংলাদেশ’ শীর্ষক এক সংবাদ সম্মেলনে এ দাবি জানানো হয়। মোবাইল ফোন ইন্ডাস্ট্রি ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (এমআইওবি) এই সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে।
অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন শাওমি বাংলাদেশের কান্ট্রি ম্যানেজার ও এমআইওবির নির্বাহী সদস্য জিয়াউদ্দিন চৌধুরী। তিনি বলেন, বর্তমানে দেশে প্রবেশ করা স্মার্টফোনের প্রায় ২০ শতাংশই অবৈধ পথে বা গ্রে মার্কেটের মাধ্যমে আসছে। এর ফলে বছরে প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকার ব্যবসায়িক লেনদেন আনুষ্ঠানিক খাতের বাইরে থেকে যাচ্ছে, যা সরকারকে বিপুল পরিমাণ কর ও রাজস্ব থেকে বঞ্চিত করছে।
তিনি আরও বলেন, ৩০ হাজার টাকার বেশি দামের ফোনের অফিশিয়াল বিক্রি কার্যত থমকে গেছে। দেশে উৎপাদন সক্ষমতা ও দক্ষতা থাকা সত্ত্বেও ৪৩ শতাংশ কর ফাঁকি দেওয়া গ্রে মার্কেটের পণ্যের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করা সম্ভব হচ্ছে না। এনইআইআর বাস্তবায়ন হলে স্থানীয় উৎপাদন বাড়বে এবং ফোনের দামও সাধারণের নাগালের মধ্যে চলে আসবে।
অবৈধ ফোন বন্ধ হলে হাজার হাজার ব্যবসায়ী পথে বসবেন—সম্প্রতি মোবাইল ব্যবসায়ীদের একাংশের এমন দাবির জবাবে জিয়াউদ্দিন চৌধুরী বলেন, ‘আমাদের গবেষণায় (ইনসাইট মেট্রিক্স লিমিটেড পরিচালিত) দেখা গেছে, বাংলাদেশে স্মার্টফোন বিক্রির খুচরা দোকান রয়েছে প্রায় ১৩ হাজার। এর মধ্যে ৯০ শতাংশ দোকানই বৈধ ও অফিশিয়াল পণ্য বিক্রি করে। মাত্র ১ হাজার থেকে ১ হাজার ৫০০ দোকান একচেটিয়াভাবে ব্যবহৃত বা অননুমোদিত ফোন ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। তাই ২০ হাজার দোকান বন্ধ বা ২০ লাখ পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার দাবিটি বানোয়াট এবং জনসমর্থন আদায়ের কৌশল মাত্র।’
সরকারের রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যকে সমর্থন জানিয়েও আসন্ন বাজেটে স্মার্টফোনের ওপর বিদ্যমান ৪৩ শতাংশ কর পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানান জিয়াউদ্দিন চৌধুরী। তিনি বলেন, ‘স্মার্টফোনকে কেবল একবার কর আদায়ের বিলাসদ্রব্য হিসেবে দেখা ঠিক নয়। এটি এমএফএস, ডেটা ব্যবহার এবং ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে বারবার রাজস্ব আয়ের একটি মাধ্যম। স্মার্টফোন সহজলভ্য হলে দেশের ডিজিটাল প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত হবে।’
সংবাদ সম্মেলনে এমআইওবির সভাপতি জাকারিয়া শহীদ বলেন, ‘অনেকের ভুল ধারণা রয়েছে যে আমরা কেবল বিদেশ থেকে যন্ত্রাংশ এনে জোড়া দিই বা “প্যাচ আপ” করি। আমাদের সদস্যরা এখন সাধারণ সংযোজন থেকে সরে এসে এসএমটি (সারফেস মাউন্ট টেকনোলজি) এবং পিসিবিএ (প্রিন্টেড সার্কিট বোর্ড অ্যাসেম্বলি)-এর মতো উন্নত উৎপাদন ধাপে চলে গেছেন।’
তিনি জানান, বর্তমানে স্থানীয় উৎপাদনে ১৫ থেকে ২০ শতাংশ মূল্য সংযোজন (ভ্যালু অ্যাডিশন) হচ্ছে, যা প্রতিবেশী দেশগুলোর সমপর্যায়ের। এনইআইআর-এর মাধ্যমে একটি সুশৃঙ্খল বাজার ব্যবস্থা নিশ্চিত করা গেলে উচ্চমূল্যের ফোনগুলোও দেশে উৎপাদনের মাধ্যমে কম দামে গ্রাহকের হাতে তুলে দেওয়া সম্ভব হবে বলে জানান তিনি।