হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের আমির আল্লামা শাহ মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরীসহ ১০১ জন বিশিষ্ট আলেমের এক বিবৃতির ভিত্তিতে ‘জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোট কোনো ইসলামি জোট নয়’ শীর্ষক একটি খবর মূলধারার একাধিক সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। এসব সংবাদ প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে, বৃহস্পতিবার (১ জানুয়ারি) ‘দাওয়াতুল ইহসান বাংলাদেশ’ নামক একটি সংগঠনের প্যাডে প্রচার সম্পাদক মাহদী হাসান বিবৃতিটি পাঠিয়েছেন।
বিবৃতির শেষে ১০০ জন আলেমের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। তাদের মধ্যে অন্যতম হলে, আল্লামা শাহ মুহিববুল্লাহ বাবুনগরী (মহাপরিচালক, বাবুনগর মাদরাসা, চট্টগ্রাম), আল্লামা খলিল আহমাদ কুরাইশী (মহাপরিচালক, হাটহাজারী মাদ্রাসা), আল্লামা আব্দুল হামিদ পীর সাহেব মধুপুর, মাওলানা আব্দুল মালেক (জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের খতিব) প্রমুখ।
তবে বিবৃতির খবর সংবাদমাধ্যমে আসার পর কয়েকজন আলেম ফেসবুকে নিজেদের প্রোফাইল বা তাদের পরিচালিত মাদ্রাসার পেইজ থেকে জানান যে, আলোচ্য বিবৃতিতে তাদের নাম থাকলেও তারা এবিষয়ে কিছুই জানেন না।
ফেসবুকে এমন একাধিক পোস্টের প্রেক্ষিতে বিবৃতিতে নাম আছে এমন কয়েকজন আলেমের সাথে যোগাযোগ করে জানার চেষ্টা করেছে তারা বিবৃতিটির বিষয়ে জানেন কিনা। আট জন আলেমের মোবাইল নম্বর সংগ্রহ করে ফোন দিলে পাঁচজনের সাথে কথা বলা সম্ভব হয়েছে। তারা সবাই বলেছেন তারা বিবৃতির বিষয়ে জানেন না। বাকি তিনজনকে ফোনে পাওয়া যায়নি।
বায়তুল মোকাররমের খতিব মুফতি আব্দুল মালেকের নাম রয়েছে বিবৃতিতে ১৩ নম্বরে। তাঁর ব্যক্তিগত নম্বরে একাধিকবার কল করে পাওয়া যায়নি। পরে তাঁর ব্যক্তিগত সহকারী মাওলানা জহিরের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, এই বিবৃতির ব্যাপারে খতিব সাহেব কিছুই জানেন না। তিনি বিবৃতিতে নাম দেননি।
২২ নম্বরে নাম থাকা মুফতি ফয়জুল্লাহ্ সন্দীপি বলেছেন, এ ব্যাপারে আমি কিছু জানিনা। খোঁজ খবর নিয়ে দেখতে হবে।
৪৮ নম্বরে নাম থাকা মাওলানা আবু সাবের আব্দুল্লাহ বলেন, এটা যে ইসলামী জোট না আমরা আগেই বলেছি। তবে এই বিবৃতিতে আমি নাম দিইনি।
৪৯ নম্বরে নাম থাকা মাওলানা আহমদ মায়মুন বলেছেন, এই বিবৃতিতে আমার নাম কিভাবে এলো সেটি জানা নেই।
৭৮ নম্বরে নাম থাকা মুফতি আনওয়ারুল হক বলেন, আমি কোনো আলেমের বিপক্ষে কখনোই বিবৃতি দিতে পারি না। এখানে আমার নাম না জানিয়ে দেয়া হয়েছে। আমি এগুলোর সাথে একমত নই।
কয়েকজন আলেমের ফেসবুক পোস্ট
বিবৃতির খবর সংবাদমাধ্যমে আসার পর কয়েকজন আলেমের পক্ষ থেকে ফেসবুকে পোস্ট করে জানানো হয় যে, তারা এই বিবৃতির বিষয়ে কিছু জানেন না।
যেমন, বিবৃতির ৭ নম্বরে নাম থাকা মুফতি রশিদুর রহমান ফারুকের ভাতিজা ওয়ালিদ আল হামিদী তার ফেসবুক পোস্টে লিখেছেন, কমিবেশি ১০ দল নিয়ে যে নির্বাচনী সমোঝতা বা জোট যেটাই হচ্ছে এটা ইসলাম ভিত্তিক নয় মর্মে ১০১ আলেমের বিবৃতির সংবাদ বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে দেখা যাচ্ছে। উক্ত বিবৃতি যারা দিয়েছেন তন্মধ্যে প্রথম সারিতে রাখা হয়েছে আঞ্জুমানে হেফাজতে ইসলামের আমীর বিশিষ্ট আলেমে দ্বীন আমার চাচা মুফতি রশিদুর রহমান ফারুক হামিদী বর্ণভী হাফিঃ কে। এটা দেখেই কেমন যেন খটকা লাগলো। কারণ আমাদের পরিবারে বড়রা আমাদেরকে মতভেদ আর দলাদলি পায়ের নিচে ফেলে হাঁটতে শিখিয়েছেন।ব্যক্তিগত মতামত থাকতে পারে, কিন্তু সেটাকে কেন্দ্র করে বিভক্তিমূলক স্টেইটমেন্ট আসবেই না। আমি এটা দেখে তথ্যটা ভেরিফাই করার চেষ্টা করলাম। উনার ছেলে আমার চাচাতো ভাইয়েরা আমাকে জানিয়েছেন চাচা এরকম কোনো স্টেইটমেন্ট দেননি। দলবাজির জন্য মানুষ কতটা যে নিচে নামতে পারে। মিথ্যা অপবাদ দিয়ে নিজের স্বার্থ হাসিল করতে তৎপর। এজন্য প্রায় সময় বলি এদেশের মানুষেরা নিজের সমর্থিত দলকে যেভাবে প্রায়োরিটি দেয় সেভাবে যদি দ্বীনকে প্রায়োরিটি দিত তবে অনক সহজে জান্নাতী হওয়া যেত এবং দেশে দ্বীন কায়েম সহজ হয়ে যেত। তবে হ্যাঁ! আমি মনে করি- এ নির্বাচনী সমোঝতা বা জোট যা ই বলেন এটার ভিত্তি ইসলাম নাকি কী এটা পরিস্কার থাকা দরকার। জোট যেটা হচ্ছে প্রথমে এটা ইসলামী জোট হিসেবে পরিচিতি পেলেও এনসিপি আসার পর বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন স্টেইটমেন্ট দেখা যাচ্ছে। আমি চাই স্টেইটমেন্ট এভাবে আসুকঃ ইসলামী ও সমমনা দলগুলোর নির্বাচনী সমোঝতা বা জোট। যেটার বেইজ থাকবে ইসলাম।
এছাড়াও ৫৯ নম্বরে থাকা মাওলানা আতাউল হক জালালাবাদীর ছেলে আরিফুল হক জালালাবাদী তার ফেসবুক পোস্টে লিখেছেন, জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোট শরিয়া-ভিত্তিক কোনো ইসলামী জোট নয়: দেশের শীর্ষ ১০১ আলেমের বিবৃতি—শিরোনামে একটি সংবাদ প্রচার করা হচ্ছে। ডেইলি ইনকিলাবেও আসছে। দেশের শীর্ষ ১০১ আলেমের বিবৃতির মধ্যে ৫৯ নম্বরে আব্বাজান মাওলানা আতাউল হক জালালাবাদী হাফিযাহুল্লাহ-এর নাম দেয়া হয়েছে। এটি একটি মিথ্যা প্রচারণা। আমি আব্বাজানকে এ বিষয়ে জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন— আমি এ বিষয়ে কিছুই জানি না।
বিবৃতিতে ৬১ নম্বরে জামেয়া ইসলামিয়া আরাবিয়া শামীমাবাদ সিলেটের মুহতামিম হাফিয মাওলানা সৈয়দ শামীম আহমদ-এর নাম দেয়া হয়েছে। কিন্তু তার নামও তার অজ্ঞাতসারে ব্যবহার করা হয়েছে বলে জামিয়া শামীমাবাদ সিলেট এর ফেসবুক পোস্টে জানানো হয়েছে।
জামেয়া শামীমাবাদ সিলেট নামে একটি ফেসবুক পেইজের পোস্টে বলা হয়েছে, দেশের শীর্ষ ১০১ আলেমের বিবৃতির মধ্যে ৬১ নম্বরে জামেয়া ইসলামিয়া আরাবিয়া শামীমাবাদ সিলেটের মুহতামিম হাফিয মাওলানা সৈয়দ শামীম আহমদ-এর নাম দেয়া হয়েছে। এ ব্যাপারে হযরত মুহতামিম সাহেব হুজুরকে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন, এটি একটি মিথ্যা প্রচারণা। ব্যক্তিগতভাবে কিংবা লোক মারফতে আমার নাম প্রদান কিংবা উল্লিখিত বক্তব্যের ব্যাপারে আমার কোনো অবগতি নেই। আমার অজ্ঞাতে এবং কোনো ধরণের সম্মতি ব্যতিত এমন মিথ্যার আশ্রয় নেওয়ার আমি তীব্র নিন্দা জানাচ্ছি। অতএব প্রকাশিত সংবাদের ব্যাপারে কাউকে বিভ্রান্ত না হবার আহ্বান জানানো যাচ্ছে।