বাংলাদেশ এখন এক গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় নির্বাচনের মুখে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু এই নির্বাচন কেবল ক্ষমতার পালাবদলের ঘটনা নয়। এটি রাষ্ট্র, নাগরিক এবং মানবতার পরীক্ষা, যেখানে নাগরিকই চূড়ান্ত নির্দেশক। যে রাষ্ট্র কথার সঙ্গে কাজ মিলিয়ে নাগরিককে সম্মান দেয়, সে রাষ্ট্র টিকে থাকে। যে রাষ্ট্র কথা বলে কিন্তু কাজ নয়, সে সমাজকে বিভ্রান্ত করে। এই পরীক্ষায় তিনটি দেশের পাঠ আমাদের শিক্ষা দেয়, সুইডেন, ভ্রুনাই এবং বাংলাদেশ।
সুইডেনের পাঠ স্পষ্ট। শক্তিশালী রাষ্ট্র মানে নৈতিক ও মানবিক প্রতিষ্ঠান। আইন সবার জন্য সমান, বিচার স্বাধীন, প্রশাসন ব্যক্তি নয়, নীতির অধীনে কাজ করে। স্বাস্থ্য, শিক্ষা, সামাজিক সুরক্ষা, সব নাগরিক অধিকার। কথার সঙ্গে কাজের মিল এত দৃঢ় যে নাগরিক ভয় পায় না, বরং বিশ্বাস পায়। উদাহরণস্বরূপ, সরকারি হাসপাতাল ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সবার জন্য উন্মুক্ত। দুর্নীতিমূলক ঘটনা ধরা পড়লেই প্রশাসন দ্রুত ব্যবস্থা নেয়। আদালত এবং পুলিশ প্রশাসনের স্বচ্ছ, স্বতন্ত্র ও নিরপেক্ষ ভূমিকা সুইডেনের নাগরিকদের আস্থা তৈরি করে। নাগরিকরা তাদের অধিকার ও দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন, যা রাষ্ট্রকে স্থিতিশীল রাখে। গণতন্ত্রের শক্তি ব্যক্তির ওপর নয়, নৈতিক প্রতিষ্ঠান ও সামাজিক বিশ্বাসের ওপর নির্ভর করে।
ভ্রুনাই দেখায়, গণতন্ত্র সীমিত হলেও নৈতিক দায়িত্ব ও মানবিকতা রাষ্ট্রকে স্থিতিশীল রাখে। সুলতানের শাসনে মৌলিক চাহিদা পূরণ, নিরাপত্তা, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা এবং সংযম বজায় থাকে। মত প্রকাশ সীমিত হলেও নাগরিকের জীবন নিরাপদ থাকে। উদাহরণস্বরূপ, ভ্রুনাইতে সামাজিক নিরাপত্তা ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার কারণে জনগণ রাষ্ট্রের প্রতি আস্থা রাখে। এটি শেখায়, স্বাধীনতা না থাকলেও রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা নির্ভর করে দায়িত্ববোধ এবং মানুষের মৌলিক নিরাপত্তার ওপর।
বাংলাদেশ আজ সেই পরীক্ষার মুখে। কথার সঙ্গে কাজের দূরত্ব ক্রমশ বাড়ছে। রাষ্ট্র বলে গণতন্ত্র, আইন ও মানবাধিকার, কিন্তু বাস্তবে আইন প্রয়োগ হয় পরিচয়ভিত্তিক, ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত, ভিন্নমত শাস্তিযোগ্য। নাগরিক প্রায়ই রাষ্ট্রের ভাড়াটে। কথার সঙ্গে কাজের এই অমিল সমাজে বিশ্বাসের সংকট, নৈতিক ও মানবিক অবক্ষয় বৃদ্ধি করছে। উন্নয়ন প্রকল্পের বড় বাজেট থাকলেও প্রান্তিক জনগণের জীবনমান অপরিবর্তিত। দুর্নীতি, ভোট চুরি, প্রশাসনিক ক্ষমতার অপব্যবহার, হত্যা এবং অপরাধ, এসব পরিস্থিতি সমাজে আতঙ্ক ও অসন্তোষ তৈরি করছে। উদাহরণস্বরূপ, একটি উপজেলা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে সরকারিভাবে বরাদ্দকৃত ওষুধ প্রান্তিক মানুষের কাছে পৌঁছায় না। স্থানীয় প্রশাসন রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে সমস্যার সমাধান করে না।
এই সংকটময় পরিস্থিতিতে মানবিক, সাংস্কৃতিক ও সাহিত্যিক সংস্থা নাগরিকদের জন্য দিকনির্দেশক। এটি কোনো রাজনৈতিক দল নয়। এটি মানুষের নৈতিক চেতনা, বিবেক এবং সাংস্কৃতিক কণ্ঠ। সাহিত্য ও সংস্কৃতি রাষ্ট্রকে টেকসই রাখে। উদাহরণস্বরূপ, নাগরিক শিক্ষা আন্দোলন, কবিতা উৎসব, সাংস্কৃতিক কর্মশালা, এগুলো মানুষকে সচেতন করে এবং নৈতিকতার দিকনির্দেশনা দেয়। যখন রাষ্ট্র কথা বলে কিন্তু কাজ নয়, তখন এই কণ্ঠই সত্যের প্রতিফলন। নাটক, সাহিত্য বা স্থানীয় কবিতা পাঠের মাধ্যমে মানুষ নিজের অভিজ্ঞতা ও নৈতিক প্রশ্ন সামনে আনতে শেখে।
এক রাতেই পরিবর্তন সম্ভব নয়। সুইডেন বা ভ্রুনাইয়ের মতো দেশ অর্জন করতে হলে সময়, ধৈর্য এবং ধারাবাহিক সংস্কার দরকার। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, প্রশাসন, বিচার ব্যবস্থা এবং সামাজিক নৈতিকতার পরিকাঠামো পরিবর্তন অপরিহার্য। প্রশাসনকে স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ ও জবাবদিহিমূলক করতে আইন ও নীতির সংস্কার প্রয়োজন। নাগরিককেও আপোষহীন নৈতিকতা এবং মানবিক চেতনার সঙ্গে অংশগ্রহণ করতে হবে। উদাহরণস্বরূপ, স্থানীয় নির্বাচনের পরও নাগরিকদের সভা, গণমাধ্যম নজরদারি এবং প্রতিবাদ সক্রিয় রাখতে হবে।
২০২৬ সালের নির্বাচন বাংলাদেশের জন্য শেষ সুযোগ, রাষ্ট্রকে নৈতিকভাবে পুনর্গঠন করার, নাগরিককে মালিক বানানোর, উন্নয়নকে মানবিকভাবে বাস্তবায়নের।
নাগরিকের জন্য পাঁচটি দিক নির্দেশনা
১. ভয় নয়, বিবেক দিয়ে ভোট দিন। শুধু পারিবারিক বা রাজনৈতিক চাপের জন্য নয়, নিজের বিশ্লেষণ, অভিজ্ঞতা এবং তথ্য অনুযায়ী ভোট দিন।
২. ব্যক্তি নয়, নীতি দেখুন। নেতা বা দলের প্রতিশ্রুতি নয়, বাস্তব অর্জন বিচার করুন।
৩. মিথ্যাকে স্বাভাবিক ভাববেন না। রাষ্ট্রের ভাষা মিথ্যায় ভরা হলে সমাজের নৈতিকতা ক্ষয় হয়। সংবাদপত্র, সামাজিক মাধ্যম ও স্থানীয় সভার মাধ্যমে তথ্য যাচাই করুন।
৪. ঘৃণার রাজনীতি প্রত্যাখ্যান করুন। ভিন্নমতকে শত্রু ভাবা গণতন্ত্রকে ধ্বংস করে। সংলাপ, যৌক্তিক বিতর্ক এবং শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ নিশ্চিত করুন।
৫. ভোটের পরও দায়িত্ব নিন। প্রশ্ন করা, দাবি তোলা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করাই রাষ্ট্রকে নৈতিক রাখে। স্থানীয় সভা, সামাজিক উদ্যোগ ও গণমাধ্যমের অংশীদারিত্ব বৃদ্ধি করুন।
স্মরণ করুন, রাষ্ট্র বন্দুক বা ক্ষমতা দিয়ে টিকে থাকে না। রাষ্ট্র টিকে থাকে মানুষের বিশ্বাস, নৈতিকতা ও মানবিকতার কারণে।
সুইডেন দেখায়, নৈতিক প্রতিষ্ঠান রাষ্ট্রকে বিশ্বাসযোগ্য করে।
ভ্রুনাই দেখায়, দায়িত্ববোধ রাষ্ট্রকে স্থিতিশীল রাখে।
বাংলাদেশ শেখায়, নৈতিকতা হারালে উন্নয়ন অর্থহীন।
নাগরিকের দায়িত্ব হলো মানুষ হয়ে কথা বলা। আমাদের সাহিত্য, সংস্কৃতি এবং মানবিক চেতনা রাষ্ট্রকে শক্তিশালী রাখে। রাজনীতি কেবল ক্ষমতার লড়াই নয়, এটি নৈতিকতা ও মানবতার পরীক্ষা। বাংলাদেশ যদি এই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়, রাষ্ট্র স্থিতিশীল, মানবিক এবং বিশ্বাসযোগ্য হবে।
২০২৬ সালের নির্বাচন রাষ্ট্র ও নাগরিকের সম্পর্কের এক যুগোপযোগী পরীক্ষা। এটি কোনো দলের নয়, এটি প্রতিটি নাগরিকের। এখনই সময় মানুষ হয়ে কথা বলার, নৈতিক ও মানবিক চেতনার প্রতি দায়িত্ব স্মরণ করার।
রহমান মৃধা, সাবেক পরিচালক, ফাইজার, সুইডেন। rahman.mridha@gmail.com