ক্যাটাগরি: আন্তর্জাতিক

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কাছে চাকরি হারাবে ৩০ কোটি মানুষ

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (এআই) খাতে বিপুল বিনিয়োগের প্রতিযোগিতায় অংশ নিচ্ছে বিশ্বের শীর্ষ তথ্যপ্রযুক্তি কোম্পানিগুলো। অন্যদিকে আবার একই সময় বিপুল সংখ্যক কর্মী ছাঁটাইয়ে যাচ্ছে প্রতিষ্ঠানগুলো। পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছে যে, এ খাতে এতো বিপুল সংখ্যক কর্মী ছাঁটাইয়ের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন মার্কিন আইনপ্রণেতারা।

বিশেষজ্ঞদের মতে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার আগ্রাসনে আগামী কয়েক বছরের মধ্যে বিশ্বের ৩০ কোটি কর্মী চাকরি হারাতে পারে। অবশ্য কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার জেরে ২০২৩ সাল জুড়েই কর্মী ছাঁটাইয়ের কারণে অস্বস্তি বিরাজ করছিল বিশ্বের তথ্যপ্রযুক্তি খাতের তীর্থস্থান হিসেবে পরিচিত সিলিকন ভ্যালিতে।

কোম্পানিগুলো যে সব ক্ষেত্রেই ছাঁটাই হওয়া কর্মীদের কাজের জায়গাগুলো পূরণ করতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্য নিচ্ছে, তা কিন্তু নয়। তবে বিষয়টি কাকতালীয় মনে হলেও যে কোম্পানিগুলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় বিনিয়োগের ঘোষণা দিয়েছে, তারাই বেশি কর্মী ছাঁটাই করছে। এমনকি অনেক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান তো সরাসরি এআইকেই কর্মী ছাঁটাইয়ের কারণ বলে উল্লেখ করছে।

তথ্যপ্রযুক্তি জগতের কর্মীদের মধ্যে এ বিপুল চাকরিচ্যুতির ঘটনা মূলত ভবিষ্যতের তথ্যপ্রযুক্তির জগতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কারণে সংঘটিত হতে যাওয়া আরও অপ্রত্যাশিত ঘটনার পূর্বাভাস বলেই মনে করা হচ্ছে। এমনকি চলতি ২০২৪ সালে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রভাবে এ খাতের বিজনেস মডেলের অনেক কিছুই বদলে যেতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

বছরের শুরুতেই চাকরি গেছে সাড়ে ৫ হাজার কর্মীর

সিএনএন জানায়, চলতি বছরের প্রথম ১৩ দিনেই মার্কিন তথ্যপ্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে চাকরি হারিয়েছেন সাড়ে ৫ হাজার কর্মী। যে সব প্রতিষ্ঠান কর্মী ছাঁটাই করেছে, তার মধ্যে প্রথম শ্রেণির প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি ক্ষুদ্র পরিসরে থাকা স্টার্টআপ প্রতিষ্ঠানও রয়েছে।

বড় কোম্পানিগুলোর মধ্যে গত ১৩ দিনে গুগল ও অ্যামাজন থেকে চাকরি খুইয়েছেন কোম্পানি দুটির বিভিন্ন বিভাগের এবং বিভিন্ন পর্যায়ের শত শত কর্মী। অথচ এ প্রতিষ্ঠান দুটি মাসখানেক আগেই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই নিয়ে কাজ করা স্টার্টআপ প্রতিষ্ঠান অ্যানথ্রপিকে বহু বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের ঘোষণা দিয়ে পুরো প্রযুক্তি জগতকে চমকে দিয়েছিল।

এ বিগ টেক কোম্পানিগুলোর পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ডিসকর্ড তাদের মোট কর্মীর ১৭ শতাংশকে ছাঁটাইয়ের ঘোষণা দিয়েছে। এছাড়া জনপ্রিয় মোবাইল গেম পোকেমন গোতে ব্যবহৃত প্রযুক্তি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ইউনিটি সফটওয়্যারও তাদের মোট কর্মশক্তির একচতুর্থাংশকে ছাঁটাইয়ের ঘোষণা দিয়েছে। পাশাপাশি চুক্তিভিত্তিক কর্মীদের ১০ শতাংশকে ছাঁটাইয়ের ঘোষণা দিয়েছে বিশ্বের জনপ্রিয় ভাষা শিক্ষার অ্যাপ ডুয়োলিংগো।

চলতি বছরের সব মিলিয়ে প্রথম দুই সপ্তাহের মধ্যেই প্রযুক্তি খাতের সাড়ে ৫ হাজার কর্মী চাকরি হারিয়েছে বলে জানিয়েছে সিএনএন।

নতুন বছরের শুরুতেই এভাবে কর্মী ছাঁটাইয়ের প্রবণতা তথ্যপ্রযুক্তি খাতের কর্মীদের করোনো পরবর্তী ২০২২ ও ২০২৩ সালের তিক্ত অভিজ্ঞতাকে স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে। করোনা মহামারি শেষ হওয়ার পর ২০২৩ সাল ছিল বিশ্বের তথ্যপ্রযুক্তি জগতের কর্মীদের জন্য ভয়াবহ একটি বছর। সব মিলিয়ে মার্কিন তথ্যপ্রযুক্তি কোম্পানিগুলো ২০২৩ সালে ছাঁটাই করেছে ২ লাখ ৬২ হাজারের বেশি কর্মী। এর আগের বছর অর্থাৎ ২০২২ সালেও ছাঁটাই হোন ১ লাখ ৬৪ হাজার কর্মী।

তথ্যপ্রযুক্তি খাতের কর্মী ছাঁটাইয়ের সঙ্গে সব ক্ষেত্রেই যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিকাশের সম্পর্ক আছে, তা নাও হতে পারে। তবে কর্মী ছাঁটাইয়ের কারণ হিসেবে অনেকেই এ বিষয়টিকে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করছে। এ বিষয়ে তথ্যপ্রযুক্তি জগতে কর্মী ছাঁটাই মনিটরিংকারী প্রতিষ্ঠান লেইঅফসের প্রতিষ্ঠাতা রজার লি সিএনএনকে বলেন, অনেক ক্ষেত্রেই করোনা মহামারির সময় প্রযুক্তি খাতে অধিক হারে নিয়োগ দেয়া কর্মীদের ছাঁটাই করছে অনেক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান।

মূলত করোনা মহামারির সময় বিশ্বে লকডাউনের কারণে ঘরবন্দি মানুষের মধ্যে প্রযুক্তি পণ্যের চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় রমরমা ব্যবসা করে বিশ্বের প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো। বাড়তি চাহিদা সামাল দিতে ব্যাপক হারে কর্মী নিয়োগ দেয় এসব প্রতিষ্ঠান। তবে মহামারি শেষ হওয়ার পর প্রযুক্তি জগতের এ সুদিন আর থাকেনি। রাজস্ব নাটকীয়ভাবে কমে আসায় শেষ পর্যন্ত মহামারির সময় নিয়োগ দেয়া কর্মীদের ছাঁটাই করতে বাধ্য হয় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো।

তবে কর্মী ছাঁটাইয়ের ক্ষেত্রে করোনা মহামারি পরবর্তী প্রযুক্তি জগতের মন্দার পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের উচ্চ সুদের হারকেও দায়ী করেন রজার লি। তবে ছাঁটাইয়ের কারণ হিসেবে এগুলোর বদলে অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রসারকে অজুহাত হিসেবে দেখাচ্ছে বলে সিএনএনকে জানান রজার লি।

গত বছর আইবিএম এবং ড্রপবক্সের মতো প্রতিষ্ঠান তাদের কর্মী ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে অগ্রাধিকার দেয়ার কথা জানায়। সাম্প্রতিক সময়ে ডুয়োলিংগো এমনকি গুগলও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে আমলে নিয়েই তাদের শ্রম ব্যবস্থাপনা ঢেলে সাজানোর কথা জানিয়েছে।

ঝুঁকিতে কোটি কোটি মানুষের চাকরি

সব মিলিয়ে বোঝা যাচ্ছে, বর্তমানে শ্রমবাজারে বিশেষ করে, তথ্য প্রযুক্তির জগতে কর্মীদের জন্য দুঃস্বপ্ন হয়ে আসছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। যদিও শ্রমজগতের ওপর এর প্রভাব কতখানি পড়বে তা নিয়ে এখনও চূড়ান্ত কিছু বলার সময় আসেনি। তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে দিয়ে বলছেন, সামনের দিনগুলোতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কারণে পুরো বিশ্বে ঝুঁকির মুখে পড়বে কোটি কোটি মানুষের চাকরি।

এ প্রসঙ্গে খ্যাতনামা বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান গোল্ডম্যান স্যাকস গত বছরের মার্চ মাসে এক গবেষণা প্রতিবেদনে জানায়, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত উত্থানের কারণে আগামী কয়েক বছরের মধ্যেই বিশ্বজুড়ে হুমকির মুখে পড়বেন ৩০ কোটি স্থায়ী চাকরিজীবী। তাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি হুমকির মুখে পড়বেন মূলত হোয়াইট কলার অর্থাৎ বুদ্ধিবৃত্তিক কর্মীরা।

কাফি

শেয়ার করুন:-
শেয়ার