যুক্তরাষ্ট্র নির্বাচন : ধর্ম নয়, বর্ণবাদ যেখানে ফ্যাক্টর

ডেস্ক রিপোর্টার প্রকাশ: ২০২০-০৮-২৯ ১১:০৫:৪০, আপডেট: ২০২০-০৮-২৯ ১১:০৭:২৬

স্ট্রিট-এর নাম গিলফোর্ড। শহরের নাম বাফেলো। ডাউন টাউন থেকে এক কিলোমিটার দূরে। শহরের পূর্বে ইস্ট সাইডে কালো চামড়াওয়ালাদের ঘনবসতি, পশ্চিমে ওয়েস্ট সাইডে সাদা চামড়ার। উভয়ের মধ্যে হাই হ্যালো প্রেম প্রীতি থাকলেও অন্তরের কোথাও যেন সাদা-কালোর রাজনীতি। রেসিস্ট। মুখাবয়বে ভেসে উঠে। আমার বসতি যেখানে, পুরো নেবারহুড কালো চামড়ার মানুষের ঘর বসতি। আমি এশিয়ান বাঙালী হলেও আমার শরীরের চামড়াটাও অনেকটা কৃষ্ণ বর্ণের। থাকিও কৃষ্ণকালো মানুষের কমিউনিটিতে। গতকাল এক বাড়ীর আঙ্গিনায় জো বাইডেনের ফেস্টুন লাগাতে গিয়ে দেখি পাশের সাদা চামড়ার সত্তর বছরের বয়স্কার চোখের অপলকে তাকিয়ে থাকল আমার দিকে। বয়স একাত্তর হলেও বয়স্কার সাজগোজ আর মেকআপ দেখে মনে হল বয়স সতের (৭১/১৭)। চোখে চোখ রাখতেই বিমর্ষ কন্ঠে বলল, হ্যালো হোয়াটসফ। বললাম, ভাল। কিন্তু চেহরায় যেন বিরক্তির ছাপ! মলিনতা। আমার স্মিত হাসি, উদ্ভাসিত মুখে বললাম, হাই সুইটি, হাউ আর ইউ, তিনি বিমর্ষ হয়ে বলল, ইটস্ ফাইন। ও কে!
ক’টা মাস পরেই বিশ্বের অন্যতম অর্থনৈতিক শক্তিধর যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচন। এবারের নির্বাচনে ভোটের রাজনীতিতে ধর্ম নয়, বর্ণবাদই যেখানে ফ্যাক্টর। প্রান্তিক জনগোষ্টী থেকে শুরু করে সোসাইটির উচ্চ পর্যায় পর্যন্ত অপ্রকাশিত বর্ণবাদ ভোটের রাজনীতিতে কাজ করবে। এমনটাই মনে হলো। আমেরিকার ইতিহাসে যুক্তরাষ্ট্রে বর্ণবাদের শুরু ষোড়শ শতকে৷ সেই সময় কৃষ্ণাঙ্গ আফ্রিকানদের দাস হিসেবে ব্যবহারের জন্য অ্যামেরিকায় নিয়ে যাওয়া শুরু হয়েছিল৷ এরপর প্রায় এক কোটি ২০ লাখ কৃষ্ণাঙ্গ আফ্রিকানকে দাস হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রে পাঠানো হয়৷ এরপর থেকে শুরু হয় বর্ণবাদ। যা আজও কোন না কোন পন্থায় বিদ্যমান। চলতি পথে বিভিন্ন আচরনে তা দেখা যায়। আসলে আমেরিকায়ে কালো চামড়ার মানুষ সবসময়ই নিপীড়নের শিকার হয়ে এসেছে৷ তবে কিছু ব্যতিক্রম যে নেই তা নয়।

বাংলাদেশে ধর্ম দিয়ে আর যুক্তরাষ্ট্রের বর্ণ দিয়েই মানুষকে আলাদা বা পৃথক করা হয়। যদি প্রকাশ্যে স্পষ্টতর চাপ না মিললেও কিন্তু আচরনে পুরোটাই সত্য। মোট কথা যেখানেই হোক, যে দেশেই হোক ক্ষমতাবানরা দুর্বলের উপর অত্যাচার চালিয়েছে, চলছে হয়ত চলবেও। ধর্ম না হয় বর্ণের স্নায়ুযুদ্ধ। এটি সত্য, এটি বাস্তব।

যুক্তরাষ্ট্রে এবারের নির্বাচনে বর্ণবাদের এই বিষয়টি কানাঘুষা, স্পষ্টতা দেখা যাচ্ছে৷ দেশটিতে কৃষ্ণাঙ্গদের সামাজিক অবস্থান শ্বেতাঙ্গদের ধারে কাছেও নেই৷ তাই শ্বেতাঙ্গ পরিবারে জন্ম নেয়া শিশুটি শুরু থেকেই কৃষ্ণাঙ্গদের কম সামাজিক মর্যাদা নিয়ে বেঁচে থাকতে দেখছে৷ কৃষ্ণাঙ্গদের সঙ্গে তাদের বাবা-মায়ের আচরণও দেখছে৷ এবং সেটাকেই তারা স্বাভাবিক মনে করছে৷ ফলে সে-ও বড় হয়ে একই আচরণ করছে৷ যেমন বাংলাদেশে (ধর্ম-বর্ণ, সুন্নী-ওহাবী, সনাতন-ইসকন) নিয়ে প্রজন্মের পর প্রজন্ম এভাবেই চলছে ঝগড়া ফ্যাসাদ হিংসা প্রতিহিংসা৷ আমেরিকাতেও বর্ণ নিয়ে তেমনই চলছে। এটিই সত্য।

আসলে দিনের পর দিন নির্যাতন-অবহেলার শিকার হওয়ায় বেশিরভাগ কৃষ্ণাঙ্গের মনে ক্ষোভ থেকে এক ধরনের হিংস্রতা তৈরি হয়, যা তাদের আচরণে ফুটে ওঠে৷ এমন আচরণ দেখলে তৎক্ষণাৎ আমার-আপনার মনে হয়, তারা এমন কেন? এর পেছনে যে দীর্ঘদিনের নিপীড়ন লুকিয়ে আছে, তখন তা মনে করতে পারি না৷ সর্বশেষ কালো চামড়ার মানুষ ‘জর্জ ফ্লয়েড’-এর উপর নির্মম অত্যাচারে পুরো আমেরিকা যেখানে একাট্টা।

যুক্তরাষ্ট্রে একজন শ্বেতাঙ্গ পুলিশের নির্যাতনে কৃষ্ণাঙ্গ জর্জ ফ্লয়েডের মৃত্যুর পর পুরো আমেরিকা বর্ণবাদ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগে আলোচনায় ঝাঁপিয়ে পড়েছে। সে সময়ের বিভিন্ন টিভি মিডিয়া পত্রপত্রিকা (অনেক কিছু হাইড করে গেছে) কৃষ্ণাঙ্গদের যেভাবে দেখানো হয়েছে সেটা আমার মনেও প্রভাব ফেলেছে।

আসলে সাংবিধানিক অধিকার আর বাস্তবতা খুব কম দেশেই পুরোপুরি এক থাকে৷ যুক্তরাষ্ট্রে জর্জ ফ্লয়েড নিহত হওয়ায় যারা সে দেশে সবার সাংবিধানিক সমান অধিকারের বিষয়টি তুলে ধরে বিস্ময় প্রকাশ করছেন, যার প্রতিফলন এবারের নির্বাচনে প্রভাব পড়ছে। ট্রাম্প প্রশাসন ক্ষমতা গ্রহনের পর থেকে যুক্তরাষ্ট্রে অশ্বেতাঙ্গ বা বর্ণবাদে বিশ্বাসী নন, কিংবা মাইগ্র্যান্ট হওয়া নাগরিকগণের অধিকার সর্বস্তরে প্রতিষ্ঠিত করার বেলায় সংবিধান আর মাঠ পর্যায়ের বৈপরিত্য তো আরো বিব্রতকর, আরো লজ্জার৷ এবং সেটা বলার অপেক্ষা রাখে না।

বিশ্বের গুটিকয়েক রাষ্ট্র যেমন (নিউজিল্যান্ড, ফিনল্যান্ড, সু্ইজারল্যান্ড) ছাড়া আরো বেশ কিছু দেশ ছাড়া আমরা ধর্ম, বর্ণ, জাতি ও সম্প্রদায়ের মানুষ সম্পর্কেও আমরা ভিন্ন ভিন্ন হিংসাত্মক ধারণা পেয়ে থাকি৷ পরবর্তীতে বাস্তব জগতে আমরা সেসব ধারণার ভিত্তিতেই আচরণ করে চলে আসছি। যেখানে আমেরিকা বের হয়ে আসতে পারেনি। ট্রাম্প এর বড় উদাহারণ।

এটাই কিন্তু বর্তমান রিপাবলিক্যানদের স্বাভাবিক আচরণ৷ আর এ কারণেই মনে হয় আমেরিকা থেকে কখনো বর্ণবাদ যাবে না৷ এ নির্বাচনে এটি এখন বড় ফ্যাক্টর।

সাইয়িদ মাহমুদ তসলিম
প্রবাসী সাংবাদিক
ওয়েস্ট নিউইয়র্ক, বাফেলো

 

আমরা সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।