পুঁজিবাজারের উন্নয়নে অর্থমন্ত্রীর কাছে ডিএসইর প্রস্তাব

নিজস্ব প্রতিবেদক প্রকাশ: ২০২০-০১-০২ ২০:৪০:৫৭

পুঁজিবাজারের চলমান অস্থিরতা কাটাতে অর্থমন্ত্রী, বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) ও ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) পরিচালন পর্ষদের মধ্যে ত্রিপাক্ষীক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। বৃহস্পতিবার বিকেলে রাজধানীর আগারগাঁওয়ে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের এনইসি ভবনে অর্থমন্ত্রীর সাথে ডিএসইর পরিচালনা পর্ষদের এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে ডিএসইর পরিচালনা পর্ষদ একগুচ্ছ প্রস্তাবনা উপস্থাপন করেন।

ডিএসই এবং পুঁজিবাজারের লেনদেনের উপর কর হ্রাস ও বর্তমান বাজার পরিস্থিতিতে ডিএসই’র কর্পোরেট কর হার ৩৫ শতাংশ এর পরিবর্তে ১৫ শতাংশ নির্ধারণ করা। স্টক এক্সচেঞ্জের ট্রেকহোল্ডারদের কাছ থেকে ট্রেডের উপর অর্থ আইন ২০০৫ এর ৫৩ (বিবিবি) অনুযায়ী ০.০১৫ শতাংশ এর পরিবর্তে ০.০৫ শতাংশ হারে উৎসে আয়কর আদায় করা হয় যা বাংলাদেশের পার্শ্ববর্তী দেশসমূহের (ভারত ০.০১৩ শতাংশ। যার তুলনায় বাংলাদেশের কর হার ৩.৮৪ গুণ বেশী, পাকিস্তান ০.০২ শতাংশ। যার তুলনায় বাংলাদেশের কর হার ২.৫ গুণ বেশী এবং হংকং ০,০০২৭শতাংশ, যার তুলনায় বাংলাদেশের কর হার ১৮.৫১ গুণ বেশী) তুলনায় অনেক গুণ বেশী। তাই পুঁজিবাজারকে বিনিয়োগবান্ধব ও আকর্ষণীয় করে তুলতে এবং লেনদেনের উপর কর হার যৌক্তিক পর্যায়ে নির্ধারন করে ন্যায় বিচারের স্বার্থে এই কর হার ০.০১৫ শতাংশ নির্ধারন করর প্রস্তাব করা হয়।

স্বচ্ছ প্রতিবেদনের মাধ্যমে বিনিয়োগকারীদের সঠিক দিকনির্দেশনার দায়িত্বও পেশাগত হিসাববিদদের। ফলে বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ রক্ষায় নিরীক্ষকদের আরো বেশি সক্রিয় হওয়ার ওপর জোর প্রদানসহ ফিনান্সিয়াল রিপোর্টিং অ্যাক্ট (এফআরএ)এর সঠিক প্রয়াগ, নিরীক্ষকদের কোড অব কন্ডাক্ট মেনে চলা, নিরীক্ষকদের সচেতনতা বৃদ্ধি এবং তাদের সঠিক অডিট ফি প্রদানের মাধ্যমে নিরীক্ষা প্রতিবেদনের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার দাবী জানানো হয় ।

পুঁজিবাজার উন্নয়নে আইসিবি ও অন্যান্য সংস্থার সক্ষমতা বৃদ্ধি ও আইসিবি প্রতিষ্ঠার মূল লক্ষ্য ছিল সেকেন্ডারি শেয়ারবাজারের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা। বর্তমান বাজার মূলধন বিবেচনায় শেয়ারবাজারে যথার্থ সাপোর্ট নিশ্চিত করার জন্য এই প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা বৃদ্ধি জরুরী। তাছাড়া আইসিবি এর পাশাপাশি বিডিবিএল-কেও সেকেন্ডারি শেয়ার মার্কেটের প্রয়োজনে সাপোর্ট প্রদানের স্বার্থে পর্যাপ্ত তহবিল সরবরাহ ও যথাযথ বিনিয়োগের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা।

পাবলিক–প্রাইভেট পার্টনারশিপঃ লার্জ প্রাইভেট এণ্ড পাবলিক প্রজেক্ট এবং বিশেষায়িত খাত যেমন: বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র স্থাপন, এল এন জি টারমিনাল স্থাপন এবং বৃহৎ অবকাঠামো নির্মাণ প্রকল্প যেখানে বড় ইনভেস্টমেন্ট রয়েছে এবং লাভ-ক্ষতির ভিত্তিতে পরিচালিত হয় – ঐ সকল কোম্পানিগুলোর শেয়ার স্টক এক্সচেঞ্জের মাধ্যমে পুঁজিবাজারে অফলোড করে সাধারন জনগণকে ঐ সকল কোম্পানির মালিকানায় সম্পৃক্ত করা। সাধারন বিনিয়োগকারীদের এই অংশগ্রহনের মধ্য দিয়ে পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ নিশ্চিত করতে হবে।

উচ্চ ক্ষমতা সম্পন্ন সমন্বয় কমিটি গঠন ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রানালয়, বাংলাদেশ ব্যাংক, বিএসইসি’র প্রতিনিধি ও পুঁজিবাজারের বিভিন্ন অংশীজনদের নিয়ে একটি উচ্চ ক্ষমতা সম্পন্ন সমন্বয় কমিটি গঠন করা প্রয়োজন। এ কমিটি পুঁজিবাজারের উন্নয়নের লক্ষ্যে একটি দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা প্রনয়ণ, বাস্তবায়ন এবং আন্তঃমন্ত্রনালয় সমন্বয়ের মাধ্যমে পুঁজিবাজারের টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করবে।

পুঁজিবাজারের এই সার্বিক বিষয়াদি তুলে ধরে এর টেকসই উন্নয়নে যথাযথ পদক্ষেপ নিতে এবং পুঁজিবাজার উন্নয়নে অতীতের ন্যায় এখনও অর্থমন্ত্রীর সুনির্দিষ্ট ও সক্রিয় সহযোগিতা প্রয়োজন।

পুঁজিবাজার থেকে দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের ব্যবস্থা:

প্রধানমন্ত্রী শিল্পায়নে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগে ব্যাংক ব্যবস্থার উপর নির্ভর না করে পুঁজিবাজার থেকে অর্থ সংগ্রহের উপর গুরুত্ব আরোপ করেছেন। এ লক্ষ্য বাস্তবায়নের জন্য ব্যাংক আইনের যথাযথ প্রয়োগ, ঋণ মওকুফের নীতি সঠিক বাস্তবায়ন এবং ঋণখেলাপিদের যথাযথ আইনের আওতায় আনার মাধ্যমে পুঁজিবাজার থেকে অর্থ সংগ্রহে উদ্দ্যোক্তাদের উৎসাহীতকরণ। বাজারে অর্থের সরবরাহ বৃদ্ধি ও পুঁজিবাজারের দীর্ঘদিন নেতিবাচক ধারার কারণে বর্তমান অবস্থায় বিনিয়োগকারীদের বিনিয়োগ সক্ষমতা হ্রাস পেয়েছে। তাই বাজারে অর্থের যোগান বৃদ্ধির ব্যবস্থা করা, যা বাজারের গতিশীলতা বৃদ্ধি করবে।

বিষয়টির বাস্তবায়ন হলে বাজারে অর্থের যোগান বাড়বে এবং গতিশীলতা ইতিবাচক ধারায় যাবে। রাষ্ট্রয়াত্ব কোম্পানির শেয়ার পুঁজিবাজারে আনয়ন ও বাংলাদেশের পুঁজিবাজারের একটি বড় বাধা হচ্ছে ভাল মৌলভিত্তি সম্পন্ন কোম্পানি পুঁজিবাজারে আসতে চায় না। বড় এবং ভাল মৌলভিত্তি সম্পন্ন কোম্পানিকে বাজারে আনার জন্য ইতিপূর্বে পদক্ষেপ নেয়া হয়েছিল কিন্তু তা বাস্তবায়িত হয়নি।

এ লক্ষ্যে সরকার পুঁজিবাজারে রাষ্ট্রয়া কোম্পানির শেয়ার অফলোড করার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া অত্যাবশ্যক। সাধারণ বীমা ও জীবন বীমার মতো লাভজনক কোম্পানি নূন্যতম ২০ শতাংশ শেয়ার স্টক এক্সচেণ্ডের মাধ্যমে অফলোডের ব্যবস্থা করা।

টি–বন্ডের লেনদেন যথা শীঘ্র চালুকরণঃ

ট্রেজারি বন্ডের লেনদেন স্টক এক্সচেঞ্জের প্লাটফর্মে চালু করার ব্যাপারে বাংলাদেশ ব্যাংকের সহযোগিতা নিশ্চিতকরন জরুরী। এ লক্ষ্যে একটি ত্রিপক্ষীয় কমিটি কাজ করছে। কমিটির প্রস্তাবনা দ্রুত বাস্তবায়নের মাধ্যমে টি-বন্ডকে এক্সচেঞ্জের প্লাটফমে লেনদেন করার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক কে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা প্রদান করা।

পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত করতে উদ্বুদ্ধ করা:

বর্তমানে অনেক বহুজাতিক কোম্পানি বাংলাদেশে তাদের ব্যবসা পরিচালনা করছে কিন্তু তাদের খুব অল্প সংখ্যক পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত আছে। এ লক্ষ্যে সরকার ঐ সকল কোম্পানিকে বিশ্বের অন্যান্য দেশের ন্যায় পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত করতে সহযোগিতা করতে পারে। গ্রামীনফোন এবং টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রক সংস্থার দ্বন্দ্বের দ্রুত নিস্পত্তি ও পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত বাংলাদেশের বড় মোবাইল ফোন কোম্পানি গ্রামীনফোন ও বিটিআরসি’র দ্বন্দ্বের কারনে বাজারে প্রভাব পড়ছে। গ্রামীনফোনের শেয়ার পুঁজিবাজার মূলধনের একটি বড় অংশ ধারণ করছে। এ বিষয়টি নিষ্পত্তিতে দীর্ঘ সুত্রিতায় দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের মধ্যে পুঁজিবাজারে সম্পর্কে নেতিবাচক ধারনা জন্মেছে। বিষয়টির দ্রুত নিষ্পত্তি পুঁজিবাজারের ভাবমূর্তি ইতিবাচকভাবে তুলে ধরবে।

আমরা সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।