দুর্নীতিতে অভিযুক্তদের নিয়ে ডেল্টা লাইফের পর্ষদ গঠনের পায়তারা

স্টাফ করেসপন্ডেন্ট, অর্থ সংবাদ.কম, ঢাকা প্রকাশ: ২০২২-০৭-৩১ ১০:৩৭:১১

দুর্নীতিতে অভিযুক্তদের নিয়ে ডেল্টা লাইফ ইন্স্যুরেন্সের নতুন পরিচালনা পর্ষদ গঠন করার পায়তারা চলছে বলে অভিযোগ উঠেছে। সাসপেন্ড পর্ষদ থেকে নতুন পর্ষদে তিন জনকে রাখা হচ্ছে, যাদের বিরুদ্ধে অডিট রিপোর্টে অনিয়ম এবং অর্থ আত্মসাতের প্রমাণ পাওয়া গিয়েছে। এ জন্য সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন পক্ষভুক্ত হয়ে আপিল করেছেন। চলতি বছরের ৩১ জুলাই আপিল ডিভিশনের আইটেম নম্বর ৫, সি.পি. ৭৮৬/২০২২ এবং সি.পি. ৮০৪, ৮০০/২২ তে এ আপিল করা হয়। সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

সূত্র জানায়, ডেল্টা লাইফ ইন্স্যুরেন্সের নতুন পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান করা হচ্ছে হাফিজ আহমেদ মজুমদারকে। এছাড়াও প্রফেসর ড. মো. জুনায়েদ শফিককে ভাইস চেয়ারম্যান, সুরাইয়া রহমান, আদিবা রহমান, জোয়াদ রহমান, সাকিব আজিজ চৌধুরী, চাকলাদার রেজানুল আলম এবং সাকিব আজাদকে নতুন পর্ষদের পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হচ্ছে। এর মধ্যে, আদিবা রহমান প্রতিষ্ঠানটির সাসপেন্ড পর্ষদের মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা ছিলেন। আর সুরাইয়া রহমান এবং জেয়াদ রহমানও সাসপেন্ড পর্ষদে ছিলেন।

গত বছরের ১১ ফেব্রুয়ারি ডেল্টা লাইফ ইন্স্যুরেন্সের পরিচালনা পর্ষদ চার মাসের জন্য স্থগিত করে বিমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ)। একইসঙ্গে কর্তৃপক্ষের সাবেক সদস্য সুলতান-উল-আবেদীন মোল্লাকে ওই বিমা কোম্পানিতে প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। এরপর ১০ জুন ডেল্টা লাইফের পরিচালনা পর্ষদ সাসপেন্ডের মেয়াদ বৃদ্ধি করে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত অব্যাহত রাখার আদেশ দেয় আইডিআরএ। সর্বশেষ গত ১৩ অক্টোবর কর্তৃপক্ষের সাবেক সদস্য মো. কুদ্দুস খানকে ডেল্টা লাইফে প্রশাসকের দায়িত্ব দিয়েছে আইডিআরএ।

জানা গেছে, মূলত অনিয়ম দুর্নীতির অভিযোগে গত বছর ডেল্টা লাইফের পরিচালনা পর্ষদ স্থগিত করা হয়েছিল। অডিট রিপোর্টে বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির প্রমান পাওয়ায় পলিসি হোল্ডারদের স্বার্থ রক্ষার্থে ডেল্টা লাইফের পরিচালনা পর্ষদকে সাসপেন্ড করেছিল আইডিআরএ।

এর আগে হাওলাদার ইউনুস এবং ফেমস এন্ড আর দু’টি চার্টার্ড একাউন্ট্যান্টস ফার্ম কর্তৃক প্রাপ্ত অডিট রিপোর্টে সুনির্দিষ্ট ২২ টি এবং ২৫ টি অডিট আপত্তিতে কোম্পানীর অভ্যন্তরে ব্যাপক দুর্নীতি এবং অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া যায়। প্রশাসক নিয়োগের পর কোম্পানিটিতে ২০১২ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত বিস্তারিত অডিট কার্যক্রম পরিচালনার জন্য আজিজ হালিম চার্টার্ড একাউন্ট্যান্টস এবং একনাবিন চার্টার্ড একাউন্ট্যান্টস নামক দু’টি অডিট ফার্মকে দায়িত্ব দেয়া হয়।

আজিজ হালিম চার্টার্ড একাউন্ট্যান্টস সুনির্দিষ্ট পাচঁটি বিষয়ের ওপর বিস্তারিত অডিট রিপোর্ট এবং একনাবিন চার্টার্ড একাউন্ট্যান্টস ২৯ টি আর্থিক অনিয়ম, বোর্ড গঠনে অনিয়ম, এজিএম সংক্রান্ত অনিয়ম এবং সেন্ট্রাল ডাটাবেজ থেকে ডাটা ডিলিটসহ একটি আংশিক রিপোর্ট প্রদান করেছে। দুই অডিট ফার্মের প্রতিবেদনেই ভয়াবহ দুর্নীতির তথ্য উঠে এসেছিল।

এছাড়াও বিভিন্ন ভূয়া পলিসি নাম্বার তৈরি করে কোম্পানির এমডি এবং পরিচালকরা অসাধু কিছু কর্মকর্তার সহযোগিতায় প্রচুর টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন প্রতিষ্ঠানটি থেকে। এমনকি এক পলিসি নাম্বারের বিপরীতে একাধিকবার টাকা বের করারও অভিযোগও পাওয়া গিয়েছে। এছাড়াও কোম্পানির ফান্ড যথেচ্ছভাবে ব্যবহার করে বিদেশ ভ্রমণ, ডেল্টা লাইফের টাকায় গাড়ি কিনে একজন ডিরেক্টরের কোম্পানীতে ব্যবহার, অন্য কোম্পানীর কাজে ডেল্টা লাইফের টাকা ব্যবহার প্রভৃতি বিভিন্ন প্রকার অনিয়মের প্রমাণ উছে এসেছে। অডিট রিপোর্টের ভিত্তিতে দুর্নীতি দমন কমিশনে মঞ্জুরুর রহমান এবং অন্যান্যদের বিরুদ্ধে ৬৩৮ কোটি টাকার দুর্নীতির তদন্ত শুরু হয়েছে।

সাসপেন্ডকৃত পর্ষদের দায়িত্বকালে ডেল্টা লাইফে ৩৫ কোটি টাকা ভ্যাট, ৩৩০ কোটি টাকা ট্যাক্স বকেয়া রয়েছে। এছাড়াও ভ্যাট কর্তৃপক্ষ এবং ট্যাক্স কর্তৃপক্ষ কর্তৃক ডেল্টা লাইফে উক্ত টাকা বকেয়া সংক্রান্ত চিঠিও প্রদান করা হয়েছে। যদিও কোম্পানি থেকে ট্যাক্স ও ভ্যাটের খরচ বাবদ প্রচুর পরিমাণ টাকা উঠিয়ে নেয়া হয়েছে। কিন্তু ট্যাক্স ও ভ্যাট পরিশোধ করা হয়নি বলে অডিট রিপোর্টে উঠে আসে।

এছাড়াও একনাবিনের অডিট রিপোর্টে বলা হয়েছে, কোম্পানীর সাবেক চেয়ারম্যান মঞ্জুরুর রহমানের ২ লাখ ৬ হাজার ২৫০ টি শেয়ার স্পন্সর শেয়ার। বাকি শেয়ার পাবলিক শেয়ার হলেও তিনি তার সমস্ত শেয়ার স্পন্সর শেয়ার হিসেবে রেজিস্টার অব জয়েন্ট স্টক অব কোম্পানিজ-এ দেখিয়েছেন। এছাড়াও মঞ্জুরুর রহমানের পরিবার থেকে জিয়াদ রহমান, সুরাইয়া রহমান, আনিকা রহমান এবং সাইকা রহমান স্পন্সর শেয়ারহোল্ডার না হয়েও আরজেএসসি-তে স্পন্সর শেয়ারহোল্ডার হিসেবে নিজেদের দেখিয়েছেন। এদিকে ২০১২ সালে বোর্ডের কর্তৃত্ব অর্জনের পর থেকে মঞ্জুরুর রহমান পরিবার কোম্পানিটিতে একক আধিপত্য বিস্তার করে আসছেন।

বীমা আইন লঙ্ঘন করে ১০ শতাংশের অধিক অর্থাৎ ২২.৭৯ শতাং শেয়ার ধারণ করার প্রমাণ পাওয়া গিয়েছে। আইন অনুযায়ী ১০ শতাংশের অধিক শেয়ার ৩ বছরের মধ্যে বিক্রয়ের বিধান থাকলেও ৬ বছর অতিক্রম হয়ে যাবার পরেও কোন প্রকার ব্যবস্থা নেয়া হয় নি। এছাড়াও ডেল্টা লাইফের বার্ষিক সাধারণ সভায় কোম্পানী আইনের ৮৫ ধারা লঙ্ঘন করে সাধারণ কর্মচারীগন ভোট প্রদান করেছে বলে অডিট রিপোর্টে উঠে আসে।

সম্প্রতি প্রতিষ্ঠানটি সেন্ট্রাল ডাটাবেজ থেকে অডিট কার্যক্রম ব্যাহত করার উদ্দেশ্যে পলিসি সংক্রান্ত প্রায় ২৮ লক্ষ ডাটা ডিলিট, পরিবর্তন, ভূয়া ডাটা সংযোজনসহ বিভিন্ন অভিযোগে কোম্পানীর সাবেক চেয়ারম্যান মঞ্জুরুর রহমান, তার ছেলে জেয়াদ রহমান (সাসপেন্ডেড ডিরেক্টর), সাবেক সিইও আদিবা রহমান, আইটি বিভাগের ইনচার্জ কাজী এহতেশাম ফয়সাল, আইটি বিভাগের এভিপি মহসিন রেজা সহ কতিপয় অসাধু কর্মকর্তার বিরুদ্ধে গুলশান থানায় মামলা দায়ের করেছে বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ। উক্ত মামলায় হাইকোর্টে জামিন নিতে গেলে মহামান্য হাইকোর্ট জামিন প্রদান না করে আসামীদের নিম্ন আদালতে আত্মসমর্পণের নির্দেশ দেন। ডাটা ডিলিটের কারণে পলিসি গ্রাহকদের মৃত্যুদাবী এবং ম্যাচিউরড ক্লেইম পরিশোধ বাধাগ্রস্থ হচ্ছে বলে জানা গেছে।

আমরা সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।