নতুন নকশায় ফের তৈরি হবে বিএম ডিপো

ডেস্ক রিপোর্টার প্রকাশ: ২০২২-০৬-২২ ২২:৪৯:২৯

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের বিএম কনটেইনার ডিপোর অবয়বে পরিবর্তন আসছে। অপারেশনাল কার্যক্রম পুনরায় শুরু না হলেও ডিপোটিকে নতুন করে তৈরির পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে ডিপো কর্তৃপক্ষ। ভয়াবহ বিস্ফোরণ ও অগ্নিকাণ্ডে এখানে প্রাণ হারান ৪৯ জন। যাদের অধিকাংশই এ ডিপোর কর্মকর্তা-কর্মচারী। ওই দুর্ঘটনায় আহত হয়ে এখনো হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আরও অনেকেই। এত হতাহতের শোক আর আর্থিক ক্ষতি কাটিয়ে আবারও উঠে দাঁড়ানোর প্রস্তুতি শুরু করেছে বিএম ডিপো। এরইমধ্যে ডিপোর নতুন নকশা তৈরির প্রাথমিক কার্যক্রমও শেষ করেছে প্রতিষ্ঠানটি। বিষয়টি জানিয়ে সরকারি ১০ সংস্থাকে চিঠি দিয়েছে বিএম কনটেইনার ডিপো কর্তৃপক্ষ।

গত ৪ জুন রাত ৯টায় বিস্ফোরণের পর থেকে ডিপোর অপারেশনাল কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। এরপর থেকে চিঠি দিয়ে ডিপোর অপারেশনাল কার্যক্রম বন্ধ রাখে কাস্টমস কর্তৃপক্ষও। দুর্ঘটনার পর গঠিত হয় বেশ কয়েকটি তদন্ত কমিটি। তদন্ত কমিটিগুলো তাদের কাজ এখনো শেষ না করলেও বন্দর ও কাস্টমসের কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে ডিপোতে থাকা কন্টেইনারগুলো পরীক্ষার কাজ শুরু করেছে ডিপো কর্তৃপক্ষ। এরইমধ্যে পণ্যভর্তি ১৫শ টিইইউ’স কন্টেইনার অক্ষত হিসেবে পাওয়া গেছে বলে বিএম ডিপো কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। তার মধ্যে ৮৫০ টিইইউ’স রপ্তানি পণ্য এবং বাকিটা আমদানি পণ্য। এসব পণ্যের মধ্যে তৈরিপোশাক, নিটওয়্যার, অ্যাগ্রো প্রসেস ফুডসহ বিভিন্ন ধরনের রপ্তানি পণ্য রয়েছে। পাশাপাশি খাদ্যসামগ্রীসহ শিল্পের বিভিন্ন কাঁচামাল বাদেও রয়েছে প্যাকেজিং সামগ্রীও।

গত কয়েকদিন আগে ডিপোর অপারেশনাল কার্যক্রম চালু করার জন্য বন্দর ও কাস্টমস কর্তৃপক্ষকে চিঠি দেয় ডিপো কর্তৃপক্ষ। তবে এসব পণ্য খালাস কিংবা রপ্তানির বিষয়ে এখনো কাস্টমস কর্তৃপক্ষ কোনো সাড়া দেয়নি বলে জানা গেছে।

আমদানি ও রপ্তানি খাতের সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী-উদ্যোক্তারা বলছেন, আমদানি করা কাঁচামাল না পাওয়ায় অনেক প্রতিষ্ঠানে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। এছাড়া রপ্তানি পণ্যগুলোর জাহাজীকরণের মেয়াদ পেরিয়ে যাচ্ছে। চুক্তি মোতাবেক নির্ধারিত সময়ে পণ্য পাঠাতে ব্যর্থ হওয়ার কারণে অর্ডার হারানোর শঙ্কা তৈরি হয়েছে। তাছাড়া রপ্তানি পণ্যের মধ্যে অনেক পচনশীল খাদ্যপণ্য থাকায় দুশ্চিন্তায় পড়েছে প্রক্রিয়াজাত খাদ্যপণ্য রপ্তানিকারকরাও।

এ বিষয়ে বেসরকারি কন্টেইনার ডিপো মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ ইনল্যান্ড কনটেইনার ডিপো অ্যাসোসিয়েশনের (বিকডা) সভাপতি নুরুল কাইয়ুম খান  বলেন, দেশের অর্থনীতিকে গতিশীল রাখে চট্টগ্রাম বন্দর। চট্টগ্রাম বন্দরকে গতিশীল রেখেছে আমাদের অফডকগুলো। ৩৮টি আমদানি পণ্য খালাস হয় অফডক দিয়ে। এই ৩৮ পণ্যের মধ্যে কোনো ডেঞ্জারাস গুডস- ডিজি (বিপজ্জনক পণ্য) নেই। তবে অফডকগুলোর মাধ্যমে শতভাগ রপ্তানি পণ্য জাহাজীকরণ হয়।

তিনি বলেন, বিএম কন্টেইনার ডিপোতে যে দুর্ঘটনা হয়েছে তা অপ্রত্যাশিত। এরইমধ্যে প্রায় ১৮ দিন পার হতে চলেছে। ডিপোতে অক্ষত অনেক কন্টেইনার রয়েছে। আমদানি, রপ্তানি পণ্য রয়েছে। দেশের অর্থনীতির স্বার্থে এসব আমদানি পণ্য যেমন খালাস করা জরুরি, তেমনি রপ্তানি পণ্যগুলোও পাঠানো প্রয়োজন। এজন্য বিকডা’র পক্ষ থেকে আমরা বন্দর কর্তৃপক্ষ এবং কাস্টমসকে চিঠি দিয়েছি। আমরা অনুরোধ করেছি, কাস্টমস অথরিটির সুপারভিশনের মাধ্যমে বিএম ডিপোতে থাকা অক্ষত আমদানি পণ্যগুলো খালাস এবং রপ্তানি পণ্যগুলো শিগগির শিপমেন্টের উদ্যোগ নিতে। রাষ্ট্রের স্বার্থে, দেশের অর্থনীতির স্বার্থে এখন ডিপোটির অপারেশনাল কার্যক্রম চালু করা প্রয়োজন।

এদিকে অগ্নিকাণ্ড ও বিস্ফোরণে ক্ষতিগ্রস্ত ডিপোর অভ্যন্তরে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা শুরু করে ডিপো কর্তৃপক্ষ। তাছাড়া দুর্ঘটনায় আহতদের চিকিৎসার পাশাপাশি হতাহতদের জন্য সহায়তার প্রতিশ্রুত অর্থও দেওয়া শুরু করেছে প্রতিষ্ঠানটি। প্রথম ধাপে ২০ জুন হতাহত ৬৯ জনের পরিবারকে পাঁচ কোটি ৬৭ লাখ টাকা প্রদান করেছে বিএম ডিপো কর্তৃপক্ষ। চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে এসব অর্থ প্রদান করা হয়। এর মধ্যে ৩০ জন ফায়ার সার্ভিসের হতাহত সদস্যদের পরিবার ছিল। যাদের মধ্যে নিহত এবং নিঁখোজ ১৩ জনের পরিবারকে ১৫ লাখ টাকা করে, আহত অঙ্গ হারানো নয়জনকে ১০ লাখ টাকা করে, সাধারণ আহত পাঁচজনকে ছঢ লাখ টাকা করে এবং প্রাথমিক চিকিৎসা নেওয়া তিনজনকে দুই লাখ টাকা করে দেওয়া হয়।

একই অনুষ্ঠানে ডিপো কর্তৃপক্ষের নিজস্ব কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে নিহত নয় জনের পরিবারকে ১০ লাখ টাকা করে, আহত অঙ্গ হারানো তিনজনের পরিবারকে ছয় লাখ টাকা করে এবং সাধারণ আহত ১৯ জনকে চার লাখ টাকা করে দেওয়া হয়। তাছাড়া ডিপোর বাইরে থেকে আসা লোকজনের মধ্যে নিহত চারজনের পরিবারকে ১০ লাখ টাকা করে এবং আহত চারজনকে চার লাখ টাকা করে দেওয়া হয়।

হতাহতদের পরিবারকে আর্থিক সহায়তার পর এবার ক্ষতিগ্রস্ত ডিপোটিকে পুনরায় তৈরি করার পদক্ষেপ নিয়েছে বিএম ডিপো কর্তৃপক্ষ। আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় পুরোনো স্থাপনাগুলো ভেঙে নতুন করে তৈরির উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। এজন্য নতুন নকশার কাজও শুরু করে দিয়েছে প্রতিষ্ঠানটির মালিকানা প্রতিষ্ঠান স্মার্ট গ্রুপ। নতুন স্থাপনা তৈরির জন্য সরকারি ১০টি প্রতিষ্ঠানকে অবগত করে চিঠিও দিয়েছে বিএম কনটেইনার ডিপো কর্তৃপক্ষ।

গত ২০ জুন হতাহত ৬৯ জনের পরিবারকে পাঁচ কোটি ৬৭ লাখ টাকা প্রদান করে বিএম ডিপো কর্তৃপক্ষ

এ বিষয়ে বুধবার (২২ জুন) বিএম কনটেইনার ডিপোর জেনারেল ম্যানেজার ক্যাপ্টেন (অব.) মাইনুল আহসান খান  বলেন, কাস্টমস এবং বন্দর আমাদের অপারেশনাল কার্যক্রমের কোনো অনুমতি দেয়নি। আমরা এখনো পুরো ডিপোর পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজ করছি। নতুন অবকাঠামো নির্মাণ করা হচ্ছে না। তবে আমরা পুরো ডিপোটি রি-কন্সট্রাকশন (পুনর্নির্মাণ) করবো। এরইমধ্যে আমরা একটি ভবিষ্যত পরিকল্পনা তেরি করেছি। আগামী সপ্তাহ থেকে এসব পরিকল্পনা বাস্তবায়ন শুরু করবো।

তিনি বলেন, নকশা এবং পরিকল্পনার প্রাথমিক কাজ শেষ। এখন চূড়ান্ত করা হচ্ছে। পাশাপাশি বিষয়টি অবগত করে বন্দর, কাস্টমস, বিভাগীয় কমিশনার, জেলা প্রশাসক, ফায়ার সার্ভিস, পরিবেশ অধিদপ্তর, পিডিবি, সীতাকুণ্ড থানা, বিস্ফোরক অধিদপ্তরসহ ১০ প্রতিষ্ঠানকে আমরা চিঠি দিয়েছি।

বিএম কনটেইনার ডিপোর জেনারেল ম্যানেজার আরও বলেন, ডিপোর ভবনগুলো ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে গেছে। এগুলো ভেঙে নতুন করে তৈরি করতে হবে। যেহেতু তদন্ত চলছে, তদন্ত সংস্থাগুলো যদি আবার এসব ভবন এভিডেন্স হিসেবে চায়, সেজন্য তাদেরকে চিঠি দেওয়া হয়েছে। আগামী এক সপ্তাহ পর স্থাপনাগুলো ভাঙার কাজ শুরু হবে বলে জানান তিনি।

বিজিএমইএ সূত্রে জানা গেছে, বিএম কন্টেইনার ডিপোতে দুর্ঘটনার আগে পোশাক রপ্তানিকারী ১৪১ প্রতিষ্ঠানের রপ্তানি পণ্য ছিল ডিপোতে। প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের পণ্যের ক্ষয়ক্ষতির তালিকা পাঠিয়েছে বিজিএমইএকে। ১৪১টি প্রতিষ্ঠানের সবমিলিয়ে ৪৭ দশমিক ৪৪ মিলিয়ন মার্কিন ডলার (বাংলাদেশি টাকায় ৪৩৬ কোটি টাকার বেশি) মূল্যের পণ্য ছিল। এসব তৈরিপোশাক যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, চীন, অস্ট্রেলিয়া, জার্মানি, সুইডেন, নিউজিল্যান্ড, নেদারল্যান্ডস ও ডেনমার্কে যাওয়ার কথা ছিল। এর মধ্যে বেশিরভাগ পণ্যের ক্রেতা সুইডেন ভিত্তিক বিশ্বখ্যাত ব্রান্ড এইচঅ্যান্ডএম। তাছাড়া টার্গেট, ওয়ালমার্ট, টপ গ্রেড, গ্যাস্টন, ফিলিপস ভ্যান হিউসেন, পিভিএইচ, এমবিএইচ, চ্যাপ্টার ওয়ান স্পোর্টস ওয়্যার, সিঅ্যান্ডএ বায়িং, নিউ ফ্রন্টেয়ার, রচি ট্রেডার্স ইনকরপোরেশন ও বিএএসএসের কেনা পণ্যও পুড়েছে আগুনে।

আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত বিএম কনটেইনার ডিপোতে রপ্তানি পোশাক বাদেও ছিল প্রক্রিয়াজাত খাদ্যপণ্য, হাইড্রোজেন পার অক্সাইডসহ নানান পণ্য। ছিল দেশের খ্যাতনামা ও শীর্ষস্থানীয় খাদ্যপণ্য রপ্তানিকারী প্রতিষ্ঠান প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের রপ্তানি পণ্যও। ৪ জুন রাতে অগ্নিকাণ্ডের আগে বিভিন্ন দেশে রপ্তানি করতে ৩৫ লাখ ১১ হাজার ৭৩৪ ডলার মূল্যের দুই লাখ ১৯ হাজার ২০৪ কার্টন পণ্য বিএম ডিপোতে পাঠায় প্রতিষ্ঠানটি। প্রাণ-আরএফএল গ্রুপ সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।

 

আমরা সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।