উন্নয়ন ও উন্নতি

হায়দার আহমদ খান এফসিএ প্রকাশ: ২০২২-০৫-১৪ ০২:৩৩:১২, আপডেট: ২০২২-০৫-১৪ ০২:৪৯:৫৭

বাংলাদেশের ৫১ বছর বয়সে বেশ আলোচনায় আসছে উন্নয়নের প্রসঙ্গ। আমার মত মুক্তিযোদ্ধার কাছে আশার সংবাদ। আমরা বুঝতে পারছি আমাদের পরিকল্পনাবিদরা আগামি প্রজন্ম নিয়ে একটু বেশী চিন্তা করছেন। উন্নয়নের আলোচনায় জিডিপি, পার ক্যাপিটা ইনকাম আলোচনায় আসছে। আমার মনে হয় বিশ্বের এক দেশ অন্য দেশের সাথে উন্নয়ন নিয়ে আলোচনায় জিডিপি, পার ক্যাপিটা হতে পারে মাপকাটির একক। কিন্তু বাংলাদেশের মত একটি দেশ, যেদেশ ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে স্বাধীনতা অর্জন করেছে এবং স্বাধীনতার সংগ্রামের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্য ছিল দেশের অধিকাংশ মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তি।

সেই মুক্তির সংগ্রামে বর্তমানে ১৮ কোটি মানুষ, মোট জনসংখ্যার একটি বড় অংশ আজও অর্থনৈতিক মুক্তির সংগ্রামে লিপ্ত। একটি দেশের সাধারণ মানুষের উন্নয়ন মানে বেকারের সংখ্যা হ্রাস, অধিকাংশ মানুষের কাজের ব্যবস্থা, আয়ের নিশ্চয়তা।

বিগত কয়েক বছর যাবত বাংলাদেশের বেশ কিছু মেগা প্রকল্পের কাজ চলছে, ভালো কাজ, শুভ সংবাদ। সরকারের উন্নয়ন কাজের প্রভাব আসে দেশের অর্থনীতিতে পরোক্ষভাবে। সরকারের উন্নয়ন কাজে দেশের প্রধানত প্রাইভেট সেক্টরের ব্যবসার প্রসার ঘটে ফলে নতুন নতুন কাজ করার পদ সৃষ্টি হয়। বাংলাদেশের মেগা প্রকল্পের কাজের করোনার মত মহামারি এসে হাজির। ফলে বিগত দুই বছর যাবত প্রাইভেট সেক্টরের কাজও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

বাংলাদেশের যুবক সম্প্রদায়ের একটি বড় অংশ কাজের সন্ধানে বেকার ছিল, তাঁদের সাথে যুক্ত হচ্ছে একটি বড় সংখ্যার যুবক। বাংলাদেশে যেহেতু সমসাময়িক তথ্য পাওয়ার ব্যবস্থা নাই বা সহজ নয় তাই এই মুহুর্তের প্রকৃত বেকারের সংখ্যা বলা যাবে না বা সম্ভব নয়। আমরা সামাজিক জীব, আমাদের অনেক নিকট এবং পরিচিত জন যে বেকার আছে তা প্রতি মূহুর্তে বুঝতে পারছি। বাংলাদেশের মত উন্নয়নশীল দেশে মধ্যম আয় শ্রেনির একটি শিক্ষীত বেকারের সংসারে কেমন সমস্যা হতে পারে তা বলে বা উদাহরণ দিয়ে বলার প্রয়োজন নেই। বেকার সমস্যা নিয়ে আলোচনায় সংবাদ পত্রের মাধ্যমে প্রায়ই শোনা যায় আমাদের অর্থনীতিবিদের বক্তব্যে যে, নতুন নতুন কর্ম সৃষ্টির মাধ্যমেই আসল উন্নয়নের হয় তার কথা। সম্প্রতি শ্রীলঙ্কার অর্থনৈতিক সমস্যার বিষয় আলোচনায় চলে আসছে বাংলাদেশ, নেপালে অর্থনৈতিক বিষয় পর্যালোচনার সময়। বাংলাদেশ প্রসঙ্গ আলোচনায় আসতেই পারে কারণ বাংলাদেশের মেগা প্রকল্পের ব্যয় অনেকের দৃষ্টিতে তুলনামূলক বেশি, পরিকল্পনার চেয়ে সময় বেশি লাগছে, রপ্তানীর চেয়ে আমদানী বেশি। উন্নয়ন প্রকল্পের সাথে দেশের অনেক সেক্টর প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে জড়িত।

বৈদেশিক ঋণ নির্ভর উন্নয়ন কাজ যদি সময় মত বা পরিকল্পিত সময়ে শেষ না হয় তাহলে উক্ত কাজের পরোক্ষভাবে সূষ্ট কাজও দেরিতে শুরু হয় ফলে অর্থনীতিতে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের সক্ষমতা অর্জনেও বিলম্ব হয় ফলে সমস্যা দেখা দিতে পারে। অর্থাৎ পরিকল্পিত সময়ে কাজ শেষ না হলে সূষ্টি হয় বহুবিধ সমস্যা, যার দায়ভার জনগণকেই বইতে হয়। শ্রীলঙ্কার মানুষ আজ নিত্ত প্রয়োজনীয় দ্রব্য পাচ্ছে না দেখা দিয়েছে বহুবিধ সমস্যা।

আমাদের উন্নয়ন দরকার। উন্নয়নে বৈদেশিক মুদ্রা আমাদের মত দেশের অর্থনীতি যেহেতু আমদানি নির্ভর তাই বৈদেশিক মূদ্রাও দরকার বেশি। আমাদের উন্নয়নও করতে হবে এবং সমস্যাও যেন না দেখা দেয় তার ব্যবস্থা করতে হবে। বর্তমান বিশ্বে সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে উন্নয়ন কাজের জন্য এসেছে পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি) পদ্ধতি। এই পদ্ধতিকে সরকারের কাজ যেমন সহজ করেছে তেমনি দ্রুত করারও ব্যবস্থা রয়েছে। সরকার যদি পিপিপি পদ্ধতিতে উন্নয়ন কাজ অনেক পদ্ধতিতে করা যায়, তারমধ্যে বিল্ড-অপারেট- ট্রান্সফা (বিওটি) পদ্ধতি আমাদের মত দেশে যেহেতু বৈদেশিক মুদ্রার ব্যবস্থা করা কঠিন তাই এই পদ্ধতি হতে পারে উন্নয়ন বান্ধব।

তবে ব্যবসায়ীদের সাথে সরকারের চুক্তির সময় সরকারকে হতে হবে সময়ের সুযোগের সফল ক্রেতা। এখানে দুইটি পক্ষ একদিকে সরকারের পক্ষে আমলা আর অন্য পক্ষ ব্যবসায়ী। সরকারী চাকুরীতে নিয়োজীত কর্মকর্তারা প্রতিযোগীতার বিচারে সবচেয়ে কর্মক্ষম। অপর দিকে ব্যবসায়ীর হাতেও দক্ষ জনবল থাকা স্বাভাবিক কারণ যেসব প্রতিষ্ঠান সরকারের সাথে ব্যবসা করতে যাবেন তাঁদের জনবলও কোন অংশে কম না তাই স্বাভাবিক। তেমনি স্বাধীনতা তাঁদের বাড়তি সক্ষমতা। সরকারের যেমন বাজেট এবং সিদ্ধান্ত নিতে জটিলতা একটি বাড়তি সমস্যা। তেমনি আবার জবাবদিহিতার বিষয়টিও এক দৃষ্টিতে যেমন ভালো তেমনি সময়ে অসময়ে ব্যয়বহুল হতে পারে।

সম্প্রতি এক সংবাদে (প্রথমআলো, ০৭ মে ২০২২) প্রকাশ বাংলাদেশে ”বিনা টিকিটে এসি কামরায় রেলমন্ত্রীর আত্মীয়, জরিমানার পর টিটিই বরখাস্ত”। অন্য এক সংবাদে প্রকাশ হয়েছিল ব্রিটিশ পুলিশ যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী ও অর্থমন্ত্রীকে জরিমানা করেছিল। এখানে উভয় দেশের সরকারি কর্মকর্তাদের দায়িত্ব পালনের অবস্থা প্রকাশ পেয়েছে। সরকারি কর্মকর্তাদের মধ্যে সবাই নিজের যোগ্যতা প্রমানে স্বচেষ্ট। তবে মত ও পথ ভিন্ন। একদল থাকেন দায়িত্বপালনের যোগ্যতার বিচারে উত্তীর্ণ হতে। অন্য দলের কথা না বলাই ভাল। যেমন রেলমন্ত্রীর স্ত্রীর কথায় একজন সরকারি কর্মকর্তাকে আত্মপক্ষ সর্মথনের সুযোগ না দিয়ে দোষি সাবস্ত করা। বাংলাদেশের এক সরকারি কর্মকর্তা সঠিক দায়িত্ব পালনে বরখাস্ত আর যুক্তরাজ্যের বর্তমান প্রধানমন্ত্রীকে জরিমানা পরিশোধ করতে হয়েছে তাঁদেরই সরকারের এক কর্মকর্তার আদেশে। এই আদেশের বিরুদ্ধে আপীল বা অন্যকিছুর সংবাদ যেহেতু পাওয়া যায় নাই তাই বলা চলে সে রায় বহাল আছে। আমাদের সরকারি কর্মকর্তারা যদি দায়িত্ব পালনের পর এমন অবস্থার সম্মূখীন হন তাহলে কিন্তু সরকারি কর্মকর্তাদের যোগ্যতা প্রকাশের সুযোগ কমে যাবে। সব ক্ষেত্রে জাতীয় পর্যায়ে আলোচনা-সমালোচনা হবে তারপর মানুষ সুবিচার পাবে তা আশা করা যেমন ঠিক নয় বা তা সবক্ষেত্রে সম্ভবও নয়। সরকারি অফিসে স্বাভাবিক নিয়মে সুবিচার নিশ্চিত হলেই আশা করা যায় সরকারি কর্মকর্তারা যোগ্যতার বিচারে উত্তীর্ণ হবেন।

সব দিক বিবেচনায় নিয়ে যোগ্যতার বিচারে সফলতা প্রমান দিয়ে সরকার যদি ব্যবসায়ীর সাথে পিপিপি (বিওটি) পদ্ধতিতে উন্নয়ন প্রকল্প নিয়ে দেশের আর্থসামাজিক উন্নয়ন করতে পারেন তাহলে একদিকে যেমন উন্নয়ন কাজ চলমান করা যাবে তেমনি বৈদেশিক মুদ্রার পরিশোধের সক্ষমতার বিচারে সরকারের বাড়তি চিন্তা করতে হবে না। মনে রাখতে হবে আমাদের হাতের সময় মূল্যবান। রক্তের বিনিময়ের অর্জিত স্বাধীনতার স্বাধ পেতে ৫০ বছরের বেশি লাগবে বা মানা কষ্টকর।

হায়দার আহমদ খান এফসিএ
চেয়ারম্যান: এডুকেশন ডেভেলপমেনট এসোসিয়েশন-ইডিএ
[email protected]

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

আমরা সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।