ভৈরবের পাদুকা শিল্পে মধ্যস্বত্বভোগীদের দাপটে বঞ্চিত উৎপাদনকারীরা

ডেস্ক রিপোর্টার প্রকাশ: ২০১৯-১২-৩০ ১৮:৪১:১০, আপডেট: ২০১৯-১২-৩০ ১৮:৪২:২৯

কিশোরগঞ্জের ভৈরবে গড়ে উঠেছে পাদুকা তৈরির ছোট ছোট প্রায় আট হাজার কারখানা। এখানকার পাদুকা উৎপাদকরা প্রতি ডজন (১২ জোড়া) জুতা বিক্রি করেন ১ হাজার থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকায়। সে হিসেবে প্রতি জোড়া জুতা তারা বিক্রি করছেন ১০০ থেকে ১২৫ টাকায়। অথচ রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন বাজারে এক জোড়া জুতা বিক্রি হচ্ছে ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা পর্যন্ত। মূল্যের সিংহভাগ মধ্যস্বত্বভোগীদের পকেটে যাওয়ায় বঞ্চিত হচ্ছেন উৎপাদনকারীরা।

ঢাকা স্কুল অব ইকোনমিকসের (ডিএসসিই) উদ্যোক্তা অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষার্থীদের ফিল্ড ভিজিটের জরিপে এসব তথ্য উঠে এসেছে। সম্প্রতি ডিএসসিইয়ের উদ্যোক্তা অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষার্থীরা ভৈরবের কমলপুরে বিভিন্ন পাদুকা কারখানা এবং রাজধানীর পাইকারি বাজারগুলো পরিদর্শন করেন।

জানা গেছে, কিশোরগঞ্জের ভৈরবে উৎপাদিত পণ্য সারা দেশে বিক্রি হচ্ছে। কিন্তু সরবরাহ ব্যবস্থার অভাবে এখানকার উৎপাদকরা তাদের পণ্য ন্যায্যমূল্যে বিক্রি করতে পারছেন না। তারা মধ্যস্বত্বভোগীদের কাছে অতি অল্প দামে বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন। এতে উৎপাদক ও সাধারণ ভোক্তারা যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন, তেমনি সম্ভাবনাময় এ শিল্পটির বিকাশ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। পাশাপাশি অপরিকল্পিতভাবে গড়ে ওঠা এ শিল্প মানবস্বাস্থ্য ও পরিবেশের ওপর মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

শিক্ষার্থীদের জরিপের প্রাথমিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অপরিকল্পিতভাবে এ ছোট ছোট কারখানা গড়ে উঠেছে। এখানে জুতা ও স্যান্ডেলের প্রতিটি উপকরণ ও পূর্ণাঙ্গ জুতা তৈরির পৃথক কারখানা রয়েছে। এ শিল্পসংশ্লিষ্টদের প্রযুক্তিগত জ্ঞানের অভাব রয়েছে। কারখানাগুলোতে নারী শ্রমিকরা স্বল্প পারিশ্রমিক পান এবং খালি হাতে কাজ করেন। এতে মানসম্পন্ন পণ্য উৎপাদিত হচ্ছে না। আবার যেসব পণ্য উৎপাদিত হচ্ছে উৎপাদকরা সেগুলো স্থানীয় মধ্যস্বত্বভোগীদের কাছে স্বল্পমূল্যে বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন। কারখানার উদ্যোক্তা কর্মী স্বাস্থ্য ও পরিবেশ বিষয়ে সচেতন নন। চামড়া, প্লাস্টিক ও ফোমের আবর্জনার মধ্যে কোনো প্রকার প্রতিরোধক ব্যবস্থা না নিয়েই কাজ করেন শ্রমিকরা। আর এসব কারখানা বর্জ্য ফেলে রাখা হয় খোলা আকাশের নিচে উন্মুক্ত অবস্থায়। এতে মারাত্মকভাবে পরিবেশ দূষিত হচ্ছে।

এ বিষয়ে উদ্যোক্তা অর্থনীতি বিভাগের সমন্বয়ক অধ্যাপক ড. মুহম্মদ মাহবুব আলী বলেন, খুবই অপরিকল্পিতভাবে ভৈরবের পাদুকা শিল্প গড়ে উঠেছে। দীর্ঘদিনের এ শিল্প এখনো অতিক্ষুদ্র পর্যায়ে রয়েছে। এখানকার উদ্যোক্তাদের কারিগরি জ্ঞান ও সাপ্লাই চেইন ম্যানেজমেন্ট সম্পর্কে কোনো ধারণা নেই। এতে মধ্যস্বত্বভোগীরা সুবিধা পাচ্ছে। সরকারের উচিত এ ক্লাস্টারভিত্তিক শিল্পকে পরিকল্পনামাফিক গড়ে তোলা। এতে স্থানীয় পর্যায়ের শিল্পের বিকাশ হবে, মানুষের কর্মসংস্থান হবে এবং দারিদ্র্য দূরীকরণ সহজ হবে।

ভৈরব অঞ্চলের পাদুকা শিল্পের উদ্যোক্তা ও কর্মীদের উন্নয়নে ২০১৭ সালে উদ্যোগ নেয় পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশন (পিকেএসএফ)। পিপলস ওরিয়েন্টেড প্রোগ্রাম ইমপ্লিমেন্টেশন (পপি) প্রকল্পের আওতায় এ শিল্পের উদ্যোক্তা ও শ্রমিকদের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষতা অর্জন এবং আয় বৃদ্ধির মাধ্যমে জীবনমান উন্নয়ন করা হচ্ছে। কারখানাগুলোতে প্রযুক্তিনির্ভর যন্ত্রপাতি ব্যবহারের প্রশিক্ষণ দেয়া হচ্ছে। নকশা তৈরি থেকে শুরু করে জুতা উৎপাদনের প্রতিটি পর্যায় এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও রিসাইক্লিংয়ে যন্ত্রের ব্যবহার, সফটওয়্যার এবং আধুনিক যন্ত্রপাতির ব্যবহার শেখানো হচ্ছে। প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি কিনতে উদ্যোক্তাদের ঋণ-সহায়তাও দিচ্ছে পপি প্রকল্প। আটটি সার্ভিস সেন্টার ও ১২টি প্রদর্শনী কারখানার মাধ্যমে সেবা দিচ্ছে পপি। নারী উদ্যোক্তাদের প্রশিক্ষণ দেয়ার পর অর্থ-সহায়তা দেয়া হচ্ছে। এখন পর্যন্ত অন্তত ১০ জন নারী উদ্যোক্তাকে অর্থায়ন করা হয়েছে। পর্যায়ক্রমে সব কারখানার উদ্যোক্তা ও শ্রমিকদের প্রশিক্ষণ দেয়ার উদ্যোগ চলমান রয়েছে।

আমরা সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।